মিলির আদুরে বেড়াল- আহমেদ ইউসুফ

ঈদের ছুটিতে, মিলি। তার পরিবার সহ গ্রামের বাড়িতে যাবে। তার উচ্ছ্বসিত মন। কে আটকে রাখে! কার এতো সাধ্য৷ মনের ভেতরে লাফালাফি করছে তার আনন্দ। করোনার কারণে মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত বাসাবন্দী। যেই সেই বাসা নয়। কবুতরের খোপের মতো ইট-পাথরের বাসা। দম বন্ধ হয়ে যায় যায় অবস্থা। স্কুলের সহপাঠীদের থেকে শুরু করে শিক্ষকদেরও সে খুব মিস্ করছে। ভেতরে ভেতরে নিঃসঙ্গ যাপন। যদিও মা বাবার আদরে সোহাগে মোমের পুতুলের মতো লালিত পালিত। সেও তার বাসায় পোষে এক আদুরে সাদা বেড়াল। খরগোশের মতো তুলতুলে শরীর। সাদা সাদা পশমে মখমলের মোলায়েম শরীরে তার গা ঘেঁষে বসে থাকে পাশে। মিলি আদর করে তাকে ডাকে মন্টু। মন্টু বেশ বোকাসোকা শহুরে বেড়াল। বেশ নাদুস নুদুস। তার গোঁফ ধরে টানলে লজ্জায় লাল হয়ে যায় তার দুধেল মুখ।
.
গ্রামের যাবার যাবতীয় প্রস্তুতি পর্ব শেষ। প্রিয় পোষা বেড়াল ছাড়া মিলি গ্রামে যাবেই না। কেনই বা তাকে ফেলে যাবে একা বাসায়। মন্টুও হল তার সফরসঙ্গী। এটা মন্টুরও প্রথম ঈদ উদযাপন। একটা ঝুড়িতে পশমি কাপড় বিছিয়ে দিল – মিলি। মন্টু বেশ আরামে আয়েসে শুয়ে রইলো। যেন এক দুধের শিশু। ঝুড়ি দোলাতে দোলাতে বাসা পেরিয়ে রিকশায় চড়ে বাস স্টেশনে পৌঁছলো। আশপাশের লোকজনের চোখ মিলির দিকে ঝিলিক মারছে। তার হাতের ওই বেড়াল দেখে। তাদের এই চাহনি দেখে মনে হচ্ছে এক জনমে বোধহয় বেড়াল দেখেনি। কত অভিভূত দৃশ্য! কেউ কেউ আবার কপালে বিরক্তির রেখা টেনে থু থু ছিটিয়ে দূরে সরে যাচ্ছে। বাসের পাশে সিটে মন্টু আয়েশে ঘুমুচ্ছে। মিলি তার গায়ে হাত বুলাচ্ছে দেখে বাসের কিছু যাত্রী তার দিকে আড়চোখে দেখছে। কেউ কেউ মনে মনে এ আদর স্নেহ সহ্য করতে পারছে না৷ আর পারবেই বা কিভাবে? এই দুঃখ দারিদ্র‍্যের দেশে করোনা কালে নিজেদের চলতেই যেখানে মানুষ প্রতিদিন হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে আলগা পিরিতি না থাকলে এ রকম সৌখিন হওয়াও শোভনীয় নয়৷
.
মিলি, তার আদুরে বেড়ালের গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে ভাবছে। বাড়িতে পৌঁছলে। দাদুসহ তার চাচাতো ভাই বোন ও প্রতিবেশীরা বেশ আগ্রহ দেখিয়ে কোলে তোলে নিবে মন্টুকে। আদরে আপ্যায়নের মাথায় করে রাখবে। সবার জন্য একটা আশ্চর্যজনক বিষয় হয়ে উঠবে আমার পোষা বেড়াল। পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্য দেখার আনন্দকেও হার মানাবে মানুষের এই আনন্দ, এই উচ্ছ্বাস। কিন্তু বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই কেউ তার কাছে ঠিক আগের মতো এগিয়ে আসছে না। মুখ রক্ষার্থে কুশল বিনিময় করছে। মিলির বেড়াল নিয়ে মিলিকেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকতে হচ্ছে সবসময়। উফ! কি গরম। বিদ্যুৎ নেই। লোডশেডিং। বেড়ালটাও গরমে হাফিয়ে উঠেছে। একদিকে কুরবানির গরু নিয়ে মাতামাতি, মেহেদি দিয়ে হাতে নকশা করা। তার উপর বেড়াল। আড্ডায় ও গল্পের আসরে কত হৈ চৈয়ের হিরিক পড়ে গেছে এই মিঊ মিঊ স্বরে ডাকা মন্টুকে নিয়ে। আজকাল মন্টু মন্টু বলে ডাকলে সেও সাড়া দেয় না। আগের মতো। প্রতিবেলায় মন্টুর চুক চুক করে এক বাটি দুধ খাওয়া দাদুর একদম সহ্য হয় না। তার উপর বেশ হিসেবি। দাদু সাথে প্রায়ই বেড়াল নিয়ে দুষ্ট মিষ্ট অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে- মিলির। ঈদের আমেজ শেষ না হতেই এক দুঃখজনক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে মিলিকে। তার বেড়াল কে পাওয়া যাচ্ছে না। বেড়াল খোঁজার হিরিক পড়ে গেলো এ-বাড়ি ও-বাড়ি। কিন্তু কোথাও তার কোন হদিস মিললো না। ঈদের দিনও কয়েকটা দেশি বেড়াল তাকে তাড়া করছিলো। তখন কোন রকম উদ্ধার করতে পারলেও। আজ না জানি কোথায় আছে? কেমন আছে? মিলির আদুরে বেড়াল! তাকে ফেলেই আবার ঢাকায় চললো- মিলি।
.
৮ আগস্ট, ২০২০