তদন্ত রুদ্র অয়নের ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ০৪

চার
টেলিফোন কলের একটানা শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো সজীবের। বিরক্তবোধ করে সজীব। বিছানা ছেড়ে ওঠে রিসিভারটা তুলে নিয়ে বললো, ‘হ্যালো, সজীব বলছি…. কি বললেন! সলিল মিয়া.. খুন হয়েছেন! শান্তি ভিলা…? হ্যা, হ্যা অপেক্ষা করুন, এক্ষুনি আসছি।’
রিসিভার রেখে দিলো সজীব।
মনে মনে ভাবলো, অমরকে খবর দিলে দেরি হয়ে যাবে। গাড়ি নিয়ে একাই বেরিয়ে পড়লো সে। এক সময় শান্তি ভিলার সামনে গাড়ি এসে থামে। গাড়ির শব্দ পেয়ে একজন মেয়ে, বয়স আনুমানিক সতেরো আঠারো হবে ; দরজা খুলে কান্না ভেজা মলিন কণ্ঠে বললো, ‘আসুন, আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম।’
সজীব ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললো, আগে মৃত দেহের কাছে আমাকে নিয়ে চলুন।’
মেয়েটির বাবা সলিল মিয়ার ঘর এটি। সজীব দেখলো, ভয়ংকর এক দৃশ্য। সমস্ত মেঝে ছোপ ছোপ রক্তে ভরে গেছে। সলিল মিয়ার বুকে বেশ কয়েক জায়গায় ছোরা বিদ্ধ হয়েছে! এমন রোমহষর্ক দৃশ্য দেখে আর সহ্য করতে পারলোনা মেয়েটি। ‘বাবা..’ বলে আর্তনাদ করে কেঁদে ফেললো।
সজীব চারপাশটা ভালো করে দেখে নিলো। ঘরের গরাদহীন জানালাটা খোলা। ঐদিন দিয়েই বোধহয় হত্যাকারী ঘরে প্রবেশ করেছিলো। জানালাটার কাছে গিয়ে দেখলো; না তেমন কোনও চিহ্ন বা আলামত নেই।
সজীব বললো, ‘যা দেখার দেখলাম। এবার চলুন।’
ওরা ড্রইংরুমের দিকে গেলো। সজীব মেয়েটিকে শান্তনা দিয়ে বললো, ‘আপনি ভেঙে পড়লে চলবেনা। যা হবার তা তো হয়ে গেছে। মনটাকে শক্ত করুন। ভেঙে পড়বেননা প্লিজ।’
একটুক্ষণ নিরব থেকে সজীব আবার বললো, ‘আচ্ছা, পুলিশকে খবরটা জানিয়েছেন?’
চোখের জল মুছতে মুছতে মেয়েটি বললো, ‘না। জানি পুলিশে খবর দিয়ে লাভ হবেনা। আজকাল অনেক খুন খারাপির ঘটনা ঘটে। পুলিশ বা সরকারি ভাবে একটা ঘটনার সুরাহা হলে একশোটা ঘটনার কোনও সুরাহা হয়না। কোথাও কোথাও দু’একটা ভালো পুলিশ থাকলেও নিরানব্বইজন পুলিশই ধান্দাবাজ। তাই আগে আপনাকে প্রথম খবরটা দিয়েছি।’
‘বেশ। আচ্ছা বলুনতো, কে আগে সলিল মিয়ার মৃতদেহ দেখতে পায়?’
‘আমিই আগে বাবার মৃতদেহ দেখি। পাশের ঘরে থাকি আমি। হঠাৎ বিকট শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। হঠাৎ বাবার প্রাণফাটা চিৎকার শুনতে পাই। সাথে সাথে বাবার ঘরে ছুটে গিয়ে দেখি, বাবা রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। কে বা কারা বাবাকে খুন করে পালিয়েছে।’
‘বাড়িতে আপনারা কে কে থাকেন?’
‘মা বেঁচে নেই। আমি আর বাড়ির একটা কাজের মেয়ে মোমেনা। এছাড়া কেউ নেই।’
‘আপনার বাবা কি করতেন?’
‘বাবা ব্যবসা করতেন। বাবার দোকানের নাম প্রত্যাশা স্টোর্স।’
‘আচ্ছা, সলিল মিয়ার অবর্তমানে আপনিই তো হবেন প্রত্যাশা স্টোর্স এবং এই বাড়ি বা সম্পত্তির মালিক?’
‘জ্বি।’
‘গতকাল সলিল সাহেব দোকান থেকে কখন ফিরেছিলেন?’
‘রাত দশটার দিকে।’
‘প্রতিদিনই তিনি কি প্রায় একই সময় ফিরতেন?’
‘হ্যা।’
‘গতরাতে তিনি যখন বাড়ি আসেন তখন তাকে কোনও রকম অস্বাভাবিক অবস্থায় দেখেছিলেন কি?’
‘না তো।’
‘আপনার বাবা খুন হয়েছেন কিন্তু আপনাদের কোনও জিনিস চুরি হয়েছে কি?’
‘বিশেষ কিছুই চুরি হয়নি। তবে একটা চকচকে মার্বেল পাথরের মূর্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা! বাবার ঘরের আলমারীতেই ছিলো।’
সজীব কিছুটা আশ্চর্য হলো! একটা মার্বেল পাথরের মূর্তি! কেমন একটা রহস্য মনে হচ্ছে ব্যাপারটা!
সজীব ধীর কণ্ঠে বললো, ‘একজন কাজের মেয়ের কথা বললেন যে। তাকে একটু ডাকুন।’
মেয়েটি মোমেনাকে ডেকে নিয়ে এলো। মধ্যবয়স্কা। চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, একেবারে ঘাবড়ে গেছে। খুন টুনের ব্যাপার কখনও দেখেনি হয়তো।
সজীব প্রশ্ন করে, ‘আপনিই মোমেনা?’
‘হ্যা, সাব।’
‘কতদিন ধরে এখানে আছেন?’
‘প্রায় দশ বছর।’
‘গতরাতে কোনো গোলমালের শব্দ পেয়েছিলেন?’
‘না, সাব।’
‘ঠিক আছে আপনি যান। ঘাবড়ানোর কোনও কারণ নেই।’
সজীব মেয়েটিকে বললো, ‘আপনাকে ধন্যবাদ। এখন আমি যাচ্ছি। আপনি পুলিশে ফোন করে জানান। ওরা এসে মৃতদেহ নিয়ে যাক। আমি প্রয়োজন হলে আগামীকাল আবার আসবো।’
সজীব বিদায় নিয়ে চলে গেলো।
ক্রমশ চলবে __