জীবন যেখানে যেমন- রায়হান সুমন।

48379091_301209307403172_2651710201505251328_n
আমি বছর তিনেক আগে একটা টিউশনি করতাম, যাকে পড়াতাম তার মা বাবা দুজনেই মানবাধিকার কর্মী। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দুজনেই উচু পদে আসীন। বনানী সৈনিক ক্লাবের বিপরীতে নিজস্ব বাড়িতে থাকেন উনারা।
পড়ানোর সময় প্রতিদিন টেবিলে নাস্তা আসলে চোখ বড় করে তাকাতাম, যদি ভালো কিছু খাইতে দেয়? অথচ ডেইলি সেই রং চা আর টোস্ট বিস্কুট। শক্ত টোস্ট খাইতে খাইতে জিহ্বা ছিলে যেতো।
রং চা যেন বঙ্গোপোসাগরের লবনাক্ত পানি, চিনির নাম গন্ধও থাকতো না চা ‘তে। ওনারা ভদ্র লোক ছিলেন, আমি আবার এতটা ভদ্র নয়, রং চায়ে বিস্কুট ভিজিয়ে ভিজিয়ে গপগপ করে খাইতাম যেটা সম্ভবত উনাদের ভদ্রতার লেভেলে পরেনি।
চোখ বড় করে এমন ভাবে তাকাইতো মনে হয় যেন উনাদের কিডনি চাবাইয়া খাইতেছি। গুনে গুনে ৪ পিছ বিস্কুট দিতো, প্রতিদিন আশায় থাকতাম যদি আজকে ২/১ পিছ বাড়ে!
একবার বেতন দিতে গিয়ে কিছু ভাংতি টাকা দিয়েছিলো, সম্ভবত খুচরা ৪০০ টাকা, ওখানে ১০ টাকার দুটি নোট বেশি আসছিলো ভুলে। আমি টাকাটা হাতে পেয়ে না গুনেই পকেটে নিয়ে নেই। পরে যখন বাসার নিচে নামলাম, মোবাইলে পরপর তিনটে মিসডকল আসলো ওই আন্টির নাম্বার থেকে (স্টুডেন্টের মা) । পরে আমি কল ব্যাক করার পর বলতেছে রায়হান তোমার কাছে মনে হয় ২০ টাকা বেশি চলে গেছে!
আমি বললাম, আমি কি টাকা ফেরত দিয়ে যাবো?
পরে উনি বললো না থাক দরকার নেই। প্যাথটিক ব্যাপার কি জানেন?
পরের মাসে উনি গুনে গুনে বিশ টাকা কম দিয়েছিলো !
আমি পড়াতাম রাতের বেলা, বলতে গেলে ডিনারের সময়টা (৯-১০.৩০)। প্রায়শই কিচেন রুম থেকে সুস্বাদু রান্নার ঘ্রান পেতাম, মনে মনে ভাবতাম এই বুঝি বলবে আন্টি বলবে রায়হান তুমি রাতে খেয়ে যাইয়ো (!)
বিরিয়ানী লাভার হিসেবে আমার যথেষ্ট সুনাম আছে, একদিন মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে পড়াতে গেছি, কিচেন রুম থেকে বিরিয়ানীর ডেডলি স্মেল লোভনীয় ভাবে নাকে আসতেছে। কাজের মেয়ের কথাবার্তা শুনে কনফার্ম হলাম বিরিয়ানীই রান্না হচ্ছে।
সরাসরি তো আর বলতে পারি না, ছাত্রকে গুড়িয়ে ফিরিয়ে বললাম তোমার ফেভারিট প্লেয়ার কে ?
তোমার প্রিয় শখ কি?
সবশেষে যখন বললাম তোমার ফেভারিট খাবার কি? ও বললো স্যার, পিৎজা!
আমি তখন নিজে নিজে বলতে লাগলাম, জানো আমার ফেভারিট খাবার কি?
ও বললো কি স্যার? আমি বললাম বিরিয়ানী (বিরিয়ানী কথাটা একটু জোড়েই বলেছিলাম) যদি একটু দুরেই সোফায় বসে থাকা আন্টির কানে পৌছায় !!
ভাগ্যদেবী সহায় হলো না আমার, খাওয়া হলো না বিরিয়ানীও, সেই চা বিস্কুট ই একমাত্র খাবার।
বিলিভ মি এই টোস্ট বিস্কুটের উপর আমার কঠিন অভিশাপ আছে, আছে রাগ অভিমান ক্ষোভ ! এখনো সেই লিজেন্ডারি টোস্ট দেখলে শিহোরিত হয়ে যাই। ওই টিউশনি ছাড়ার পর থেকে আর জীবনেও টোস্ট বিস্কুট মুখে দেই নি, গড প্রমিজ !
জীবন যেখানে যেমন!
উপলব্ধির ডায়েরি ২
print

কমেন্ট করুন