এই মৃত্যুর মিছিলের যাত্রী।

লেখা : মীর সজিব
এই মৃত্যুর মিছিলে বেঁচে থাকতে পারবো তো আমি? আমি কি আমার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারবো? আমার জীবনসঙ্গী’র সাথে শেষ সাক্ষাৎ হবেতো? যেই মাটিতে আমার জন্ম সেই মাটির ছোঁয়া কি আমার শরীরে স্পর্শ কাটবে, নাকি আমার জন্মভূমি তে মাটি দিতেও একদল মূর্খলোক বাধা দিবে যে আমার শরীরের করোণা’র জীবাণু আছে আমার লাশ’টা এই কবরস্থানে দাফন করা যাবেনা? মায়ের হাতের রান্না গোশতের ঘ্রাণ’টা যেন ইদানীং একটু বেশিই মনে পরছে। এমন অগণিত প্রশ্ন প্রতি নিয়তো মাথার মাঝে ঘোরপাক খাচ্ছে।
করোনা’র এই ভয়াল থাবা যেন ক্রমান্বয়ে চোখের সামনেই আসতেছে। এই বুঝি আমি নিজেই আক্রান্ত হয়ে গেলাম। এই ভাইরাস’টি এতই ভয়ংকর যে, আমার ভুলের কারণে আমার হলো তা যেন অন্য কোথাও না ছড়ায় সেটার ও কোন গ্যারান্টী দিতে পারবো নাহ। আমি আক্রান্ত হলে আমার সংস্পর্শে আসা ব্যাক্তিটিও আক্রান্ত হবে। এ যেন কোন রোগ নয় এ যেন এক জীবন্ত গজব মানবজাতির জন্য। জীবীকার তাগিদে আমার মতো শহরে আসা ছেলেগুলোর আহাজারি একমাত্র চার-দেয়াল ছাড়া কেউ যেন শুনতে পাচ্ছে নাহ। বেসিনের বিভ কক’টায় বলতে পারবে তার পানির স্পর্শে কত চোখের পানি মিলিয়ে নিয়ে গেছে সেফটি ট্যাংকে। লক ডাউনের দিনগুলো যে কতটা বিভীষিকাময় সেটা আমার মতো পরিবার থেকে দূরে থাকা মানুষ’টি বলতে পারবে।
নিজেকে খুব দুর্ধর্ষ মনে হয় যখন করোনার আপডেট দেওয়া ওয়েব পোর্টালগুলো দেখি। প্রতি নিয়তো আপডেটগুলো এতটাই ভয়ংকর যে এই বুঝি আমার কাছের কেউ আক্রান্ত হলো। নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। গ্রামে আমার পরিবার সুস্থ আছেতো? যাদের সুখের জন্য নিজেকে দূরে রাখা তারা ভালো না থাকলে এ কষ্টের মূল্য কি? এই মৃত্যুটা এতই ভয়ংকর যে মৃত্যু নামক বাস্তব সত্যটার সময় আপন কাউকে দেখা মেলে নাহ।
বাতাসে লাশের গন্ধ এই লাইন’টি এতটাই ভয়ংকর যেন প্রতিটা বাতাসের ছোঁয়ায় যেন লাশের মিছিল হয়ে গায়ে লাগছে। এই বাতাসে যেন লাশের ছোঁয়া পাচ্ছি। প্রকৃতি তার আসল সৌন্দর্য খুঁজে পেলেও এই সৌন্দর্য্য ভোগ করার কেউ যেন নেই। কি হবে এই সৌন্দর্য্য দিয়ে যদি উপভোগ করার মানুষটায় না থাকে। গাছগুলো যেন নৃত্যের মেয়েটির মতো সেজেগুজে আছে তার সৌন্দর্য্য মানুষকে দেখাবে বলে।
যেই মানুষটা ছেড়ে এক সপ্তাহ দূরে থাকতে কষ্ট হয়ে যেত, জীবন বিভীষিকাময় লাগতো। সেই মানুষ’টা ছেড়ে আজ এক মাসের মতো দূরে রয়েছি লকডাউনের মাঝখানে পরে। না পারতেছি কাছে যেতে না সে পারতেছে কাছে আসতে। এ যেন এক মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সদ্য বিবাহিত বউ ছেড়ে দূরে থাকার কষ্টটা অত্যন্ত তারা ছাড়া কেউ বুঝতে পারবেনা। জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কিভাবে সাজানো যায় এ নিয়ে কল্পনা করা জুটিটা আজ দুইজন দুই প্রান্তে। লকডাউন কতটা ভয়ংকর এই জুটিটার কাছে চোখের প্রতিটি ফোঁটা জানে।
যাদের জীবন চাকুরি নামক মেশিনে আটকানো সেখানে করোনা’র ভয় যেন মূল্যহীন। করোনার ভয় থেকে চাকুরি হারানোর ভয় আরো বেশি ভয়ংকর। ধনীরা দিব্বি ব্যাংক থেকে জমানো টাকা নিয়ে লকডাউন কে সুন্দরভাবে উপভোগ করছে। গরিব মানুষগুলোর জন্য করোনা অত্যন্ত তিনবেলা পেটপুরে খাবারের একটা শান্তি নিয়ে আসছে। তাদের জন্য যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতা হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে সংগঠন বা রাজনৈতিক দলগুলো। অবশ্য গরীবদের সাহায্যে এগিয়ে আসা চাল চোর, গম চোর চেয়ারম্যান মেম্বারগুলোর মুখের হাসির পরিমাণটা একটু বেড়েছে। মাঝখান থেকে আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেগুলো চাকুরি নামক বাস্তবতায় আটকিয়ে লকডাউন শেষ হওয়ার পাঁয়তারা করতেছি, অত্যন্ত প্রিয়জনের মুখগুলো যেন দেখতে পারি আর প্রিয় মানুষটার হাতে যেন একমুঠো লাল কাঁচের চুরি তুলে দিতে পারি।
লকডাউনে আটকে থাকা মানুষগুলো যেন চিড়িয়াখানায় আটকিয়ে থাকা ময়ূরগুলোর মতো । সবাইকে খুশি রাখতে ময়ূরগুলো যেমন পিছনে পাখামেলে হাটে ঠিক মানুষগুলোও চোখের কোণে পানি আটকিয়ে রেখে প্রিয় মানুষটির সাথে ভিডিও চ্যাটিংয়ে কথা বলে। এই ভিডিও চ্যাটিং কোন খুশির বার্তা বয়ে আনে না এই ভিডিও চ্যাটিং দুই প্রান্ত থেকে চাপা কষ্টের সুর বয়ে আনে।
তারপরেও সুখে থাকুক পৃথিবীর মানুষগুলো, এই মৃত্যুর মিছিল যেন স্বয়ং উপরওয়ালা না থামালে থামছেই নাহ। এই মৃত্যুর মিছিল খুব ভয়ানক। লেপটপের কিপ্যাড চাপতেছি আর বাইরে প্রবল ঝড় আর চোখের পানিগুলো টুপটুপ করে কিবোর্ডের উপর পড়ছে। এই মৃত্যুর মিছিলের যাত্রী কি আম নিজেও? আমিতো আমার প্রিয় মানুষটার কাছে যেতে চাই।
বিঃদ্রঃ চাল চোর চেয়ারম্যানদের মতো লেখাটা কপি করিয়েন না। এই লেখায় অনেক আবেগ জড়িত অনেক চোখের পানি জড়িত।