অপেক্ষা- সোহাগ ইসলাম।

রিয়া আজ তাড়াতাড়ি চলে এসেছে, প্রতিবার রাফিন রিয়ার জন্য এসে বসে থাকে। আজ রাফিন কে কিছুটা চমকে দেয়ার জন্যই নিলার এই প্লান। রিয়া তার নিল শাড়ি টা পড়ে আছে রাফিন কেও বলে দিয়েছে যাতে সে তার নিল পাঞ্জাবি টা পড়ে আসে। ভালোবাসা দিবস বলে কথা। রিয়া মনে করে ভালোবাসার কোন দিবস লাগে না । তারপরও আজকের এই দিন তার কাছে স্পেশাল ই মনে হয়।

রিয়া বসে বসে ভাবতেছিলো রাফিন তার জন্য প্রতিবারি কত কষ্ট করেই না অপেক্ষা করে বসে থাকে। আর রাফিন ও কখনও দেড়ি হওয়ার কারন জানতে চায় নি। রিয়া আজ অনেক কিছু আগে থেকেই ভেবে রেখেছে । সারাদিন রাফিন এর সাথে ঘুরবে ফুচকা খাবে। ওর হাত ধরে হাটবে কথা বলবে আরো কতোকি ভেবেই যেনো সে আনন্দের আত্মহারা হয়ে যাচ্ছে । রাফিন আর রিয়ার জুটিটা বেশ দারুন। তারা একে অপরকে অনেক ভালোবাসে।একে অপরকে দেখার জন্য সব সময় ব্যাকুল হয়ে থাকে।

তাদের প্রথম দেখা হয়েছিলো গত ৪ বছর আগে বই মেলাতে। তাইতো রাফিন প্রতি বছর তাদের এনিভার্সি বই মেলায় বই কিনে পালোন করে থাকে। রাফিন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ৩য় বর্ষের ইসলামের ইতিহাস এর ছাত্র। রাফিন আর রিয়ার বাসার দূরুত্ব তেমন না হলেও মাসে তাদের মাত্র দুই একবার ই দেখা হয়। এই দিকে সামনে রিয়া এইচ এসসি দেবে তাই রিয়া ও এখন পড়ালেখা নিয়ে একটু ব্যাস্ত। রাফিন ও বলে দিয়েছে ভালো রেজাল্ট করতে হবে যাতে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে চান্স পায় তাহলেই তাদের চলে আসবে সুখের দিন। রিয়া কেও আর বাসায় মিথ্যা কথা বলে এসে দেখা করতে হবে না। রিয়ার গাধা ফুল খুব পছন্দ। ব্যাপার টা রাফিন এর কাছে বেশ ভালো লাগে। দেশের বেশির ভাগ মেয়ে গোলাপ পছন্দ করে তাই রিয়া মেয়েটাকে অনেক কিছুতেই আলাদা মনে হয়। রিয়া মেয়েটা সবসময় বেশ হাসি খুশি থাকে , আর যখন রাফিন এর পাশে থাকে তখন মেয়েটা যেনো দুনিয়ার সব কথা বলা শুরু করে দেয়। আর রাফিন ও সব সময় তার সব কথা মন দিয়ে শুনতে থাকে। রিয়া মাঝে মাঝে চিন্তা করে বাসায় বা বন্ধু বান্ধবীদের সাথে তো এতো কথা বলিনা কিন্তু রাফিন এর সাথে এতো কথা কিভাবে বলি।

এই কথা ভেবে রিয়া নিজেই হেসে ফেলে। রাফিন রিয়াকে কতোটা ভালোবাসে সে ভালোভাবেই জানে। গত বছর রিয়ার জ্বর আসছিলো যদিও সেটা রিয়া আমলে নেই নি কিন্তু সেই জ্বর টাইফয়েড এ পরিণীত হয়। ওর বাবা মা ওকে হাসপাতালে ভর্তি করায়। খবর টা রাফিন রিয়ার এক বান্ধবীর মাধ্যমে জানতে পায়। রাফিন তো পাগলের মতো করে হাসপাতাল এ ছুটে যায় কিন্তু রিয়ার বাবা মা সাথে থাকায় কাছে যেতে পারে নি কিন্তু দূরে বসেছিলো । রিয়ার কানে অবশ্য ব্যাপার টা যায় রিয়া বলে রাফিন যেনো চিন্তা না করে বাসায় চলে যায়। রাফিন কি আর সেই কথা শুনে। এক ফাকে রিয়ার মা কোথায় যেনো যায় রিয়ার বান্ধবীকে রেখে সেই সুযোগেই রাফিন ঢুকে রিয়াকে যেখানে রাখা হয়। রাফিন এর চোখ ছিলো ভেজা মনে হচ্ছিলো অনেক কেঁদেছে সে। রিয়ার কাছে গিয়েই রাফিন কাদো কাদো গলায় বললো কিচ্ছু হবে না তোমার এই যে আমি চলে এসেছি আমি আমি আছি তোমার পাশে । রাফিন প্রায় আধ ঘন্টা ধরে রিয়ার হাত ধরে বসে ছিলো।

প্রায় চার দিন রিয়া হাঁসপাতালে ছিলো রাফিন প্রতিদিন গিয়ে দূরে বসে থাকতো আর সুযোগ পেলেই কাছে যেতো। রাফিন এক তোরা গাধা ফুল আর কয়েকটা চকলেট নিয়ে তাড়াতাড়ি করে রওনা দিলো । রিক্সা পাচ্ছিলো না তাই হাটা শুরু করলো ভাবল সামনে গেলেই পেয়ে যাবো। হাটছিলো আর ভাবতেছিলো রিয়াকে আজ কেমন দেখাবে। রাফিন চিন্তা করলো আজকে যথা সম্ভব আগের চেয়েও কথা কম বলবো আর ওরমুখের দিকে তাকিয়ে শুধু শুনবো। মেয়েটার হাসিটাও ছিলো অদ্ভুত সুন্দর যেনো সুধু তাকিয়ে থাকতেই মনে চায়। এমন সময় রাফিন এর কানে একটা প্রকর শুব্দ আসলো কে যেনো বলতেছে মামা সরেন সরেন!! ভালো করে তাকানোর সময় টুকুও রাফিন পেলো না । আচমকা একটা বাস অনেক জোড়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো। রাফিন হয়তো খেয়াল ই করেই নি রিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে সে ফুটফাত ছেড়ে রাস্তায় চলে এসেছিলো। হলুদ গাধা ফুল গুলা ছিটকে দূরে পরে গেছে। মাথা ফেটে সেই রক্তে রাফিন এর নিল পাঞ্জাবি টা লাল হয়ে গেছে। চারোদিকে মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। এম্বুলেন্স এসে রাফিন কে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাঁসপাতালে নিয়ে গেলো। ডাক্তার রা সবাই ছোটাছুটি করতেছে। রাফিন এর ফোন থেকে ওর বন্ধুর ফোনে শেষ কল ছিলো তাই ওর কাছেই রাফিন এর খবর গেলো। রাফিন এর বন্ধু তার পরিবার এর সবাই কে নিয়ে ছোটে এসেছে হাঁসপাতালে। রিয়া এবার অনেক টা বিরক্তি বোধ করতেছিলো , আসতে তো এতোক্ষন লাগার কথা না। রাফিন এর ফোনে কল দেয়ার চেষ্টা করতেছিলো কিন্তু শুধু বার বার সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা বলতেছে।

রিয়া এবার ভাবতেছে আজকের এই দিনে তো সে দেড়ি করে আশার কথা না। তাহলে দেড়ি হচ্ছে কেনো? কোন সমস্যা হয় নি তো আবার। আবার নিজেই বলল আল্লাহ এগুলা আমি কি ভাবতেছি। এভাবেই আরো একটি ঘন্টা কেটে গেছে। ঠিক তখনই রাফিন এর বন্ধুর নাম্বার থেকে কল আসলো । ফোন ধরতেই বললো রিয়া তুমি কোথায় জলদি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাঁসপাতাল এ আসো। রিয়া বলল কেন কি হয়েছে রাফিন এর কিছু হয়েছে? ও বললো তেমন কিছুই হয় নি তুমি আসো বলেই ফোন কেটে দিলো। রিয়ার মন কিছুতেই কোন হিসাব মিলাতে পাড়তেছে না । সে ঊঠেই একটা রিক্সা ডাক দিয়ে রওনা হলো হাঁসপাতাল এর দিকে। আর মনে মনে নানান খারাপ চিন্তা ভাবনা আসতেছে। আর আল্লাহ্র কাছে দোয়া করতেছে যেনো খারাপ কিছু না হয়। রিয়া তাকিয়ে আছে রাফিন এর দিকে ওর মুখে অক্সিজেন লাগানো। খুব কষ্টে শাঁস নিচ্ছে। রিয়ার চোখ দিয়ে শুধু পানি বের হতেছিলো। রিয়ার বান্ধবি রিয়াকে শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করতেছিলো।

কিন্তু রিয়ার শুধু ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদতেছে। ডাক্তার বেরিয়ে আসলো রাফিন এর পরিবার এগিয়ে গেলো ডাক্তার বললেন আমাদের যতটুকু করার আমরা করেছি এবার বাকিটা আল্লাহ্র হাত। এ কথা শুনে রাফিন এর বোন কাদা শুরু করে দিলো। রিয়া এগিয়ে গেলো রাফিন এর বেড এর দিকে পাশে গিয়ে বসে কাঁদতে কাঁদতে বললো তুমি কথা দিয়েছিলে আজকে সারাদিন আমার সাথে হাটবে, ফুচকা কিনে খাওয়াবে। তুমি এভাবে শুয়ে থাকতে পারো না। জানো আজকে আমি চলে এসেছিলাম তোমার আগে তোমাকে সারপ্রাইজ দিব বলে । তাকিয়ে দেখো তোমার পছন্দের নীল শড়ী পড়ে আছি আমি।

এবার এক্টু জোরে সোরেই কেঁদে দিলো রিয়া। আবার রিয়ার বান্ধবি এসে তাকে বাহিরে নিয়ে গেলো।বিকাল ৫ টা ডাক্তার ঘোষণা করলো রাফিন আর নেই মারা গেছে। রাফিন এর বোন তো অনেক জোরে কেঁদে দিলো। রিয়ার পায়ের নিচ থেকে যেনো মাটি সরে গেছে। দৌড়িয়ে গিয়ে রাফিন এর নিথর দেহটাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতেছিলো তুমি এটা করতে পারো না কথা দিয়েছিলে এক সাথে বাঁচবে এক সাথে মরবে তাহলে আজ কেনো আমাকে একা ফেলে চলে গেলে।।

print

কমেন্ট করুন