অভিশপ্ত আত্মা(৬ষ্ঠ পর্ব)- শুভ্র ভৌমিক জয়

অভিশপ্ত আত্মা(ধারাবাহিক)
শুভ্র ভৌমিক জয়
৬ষ্ঠ পর্ব:
একশো টুকরোর দুটি লাশ! লাশ দুটি সেই মানুষদের যারা উপমা আর উমার সমস্ত
কর্মকাণ্ডের নজরদারি করত। অমিতের বিশাল বাড়ির সেই পাহাড়াদার গুলো। সেই রাতের অন্ধকারে উপমার ক্রোধের শিকার হয় তারা।সম্পূর্ণ একশো টুকরো করে তাদের চেহারার আকৃতি বিকৃত করে আতংক সৃষ্টি করতে চেয়েছিলো।সেই সব মানুষদের মনে যারা নিস্পাপ একটি মেয়ের ক্ষতি করার ভাবনা ওদের মাথায়ও না আসে। সব সময় যেন ওদের চেহারার মাঝে এই সমস্ত ভয় লুকিয়ে থাকে। ভয়ানক এক মৃত্যু ভয়!
খুন করেই উপমা উমাকে নিয়ে এই গ্রামের সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছিলো। তারমধ্যেই বাড়ির সকলের সামনে চলে আসে ভয়ানক লাশ দুটো। চারদিকে খোঁজ চালিয়ে মহাসড়ক থেকে উদ্ধার করে উপমা আর উমাকে।
এতক্ষনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো অমিত। লাশ দুটো যদি উপমা আর উমার হতো তাহলে তার কখনোই অমরত্ব লাভ করা হতো না।
কিন্তু এ ভয় তার মনে একটুও প্রভাব বিস্তার করে নি। উপমা পাষাণ অমিতের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে দীর্ঘ সময় ধরে।সে ভাবছে, মানুষ তো এক মাটির পুতুল মাত্র।
উপরওয়ালার সৃষ্ট জীবন্ত কোনো কিছু অমর নয়।জন্মিলে মরিতে হবে একথা এই মূর্খের মস্তিষ্কে কেনো কাজ করছে না?
হঠ্যৎই অচেতন হয়ে যায় উপমা। তারা উপমাকে বন্দী করে রাখে এক অন্ধকার রুমে। উমার নাগালের বাহিরে। সম্পূর্ণ অন্ধকারে তার জ্ঞান ফিরে। কিছু সময়ের মধ্যে উপমার চোখে যেন একধরনের ভয় জন্মায়।
অন্যদিকে বাড়ির বাহিরে ঘটছে অন্যরকম এক আলো-ছায়ার খেলা। অমিতের সাথে থাকা উমা মাকে ছাড়া কয়েকদিন ধরে কোনো কিছুই মুখে তুলছে না। চিন্তিত হয়ে পড়েছে অমিত ও তার মা। এভাবে চলতে থাকলে তো তাদের অমরত্বের কথা ভুলতে হবে। যা তাদের পক্ষে ভুলে যাওয়া কখনো সম্ভব নয়। অমিত তার পরিচিত এক কবিরাজকে বাড়িতে নিয়ে আসে । নিজের মেয়ে উমার চিকিৎসার জন্যে।
বাড়ির আঙ্গিনায় ডুকতেই কবিরাজ নিজের চোখ কপালে তুলে নেয়। কেমন যেন একটা অদ্ভুত শক্তির আভাস পাচ্ছে সে। সেই শক্তি যেন তার আশে-পাশেই কোথাও অবস্থান করছে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই কবিরাজ কোনো সাধারণ কোনো কবিরাজ নয়।
মন্ত্র-তন্ত্র নিয়ে তার দীর্ঘ ৪০ বছরের খেলাধূলা। কবিরাজের সাথে ঘটে যাওয়া এক ভয়ানক ঘটনার পরিনামে তিনি আজ তান্ত্রিক থেকে কবিরাজের পেশায় নিজেকে নিয়ে গেছেন।
কয়েক বছর আগে এক অভিশপ্তের দল তার কাছে এক অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য সাহায্য চেয়েছিলো। কিন্তু সেই অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ তার কাছে থাকার পরও সেই অভিশপ্তদের সে সাহায্য করে নি। তার ফলাফল হিসেবে তার তিন পুরুষ আর বংশ পরমপরা থেকে আসা তান্ত্রিক শাস্ত্র তিনি আর চালিয়ে যান না। তার বংশ আজ অভিশপ্তদের ক্রোধের জন্য নির্বংশ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তারপরও সে তার সন্তান আর পরিবারকে নিজের হাতে তাদের হতে তুলে দেয় নি। শুধু কষ্ট দিয়ে সেদিন তাকে বাচিঁয়ে রেখেছিলো সে অভিশপ্তরা। বুঝিয়ে দিয়েছিলো তাদের আদেশ উপেক্ষা করার শাস্তি কতটা ভয়ানক। সেই থেকেই তিনি তার নিজ হাতে নিজের তন্ত্রবিদ্যা গুলোকে লুকিয়ে রাখে স্বমহিমায়। কিন্তু দিন বদলের সাথে সাথে সেই তান্ত্রিক কবিরাজ আজও সেই দিনটির অপেক্ষায় আছেন যে কবে সেই পচাশিদের হাতের নাগালে পাবে।
সে কেনো যেন আজ সেই অভিশপ্তদেরই গন্ধ পাচ্ছে বাড়ির আঙ্গিনায়। খুব পরিচিত একটা ধ্বনি যা শুধু বাড়িতে তান্ত্রিক , অমিত আর তার মা পেয়ে থাকেন। হঠ্যাৎই অমিত দেখতে পায় চোখের সামনে তান্ত্রিকের বিভৎস খেলা।
দেখতে পায় বিভৎস রকমের এক ভুল। এক মানুষের খোলসে অন্য কেউ।
তার শক্তিশালী একটা দেহ চাই। এ তান্ত্রিকের দেহ তেমন কোনো শক্তি নেই। তাই সে এখন অমিতকে ব্যবহার করে শুধু এক শক্তিশালী দেহ তৈরি করার জন্য। উমাকে দেখার পর তার দেহে নিজের আত্মা প্রতিস্থাপন করাই এখন তার মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে। কারন উমার শক্তি সম্পর্কে সে সবকিছুই ধরে ফেলেছে। উমা কোনো সাধারণ মেয়ে নয়।
নিজের জ্বলন্ত অগ্নিপূর্ত মন্ত্র যখন উমার শরীরকে আলোকিত করবে ঠিক তখনই সে তার নিজ দেহ থেকে পাবে এক শক্তিশালী দেহ। এক অভিনব দেহ। চার আত্মার শক্ত খুঁটির দেহ।
অন্যদিকে অন্ধকার ঘরে উপমা চোখ বন্ধ করে কাঁদছে। চোখের জ্বলে ভেসে আসছে তান্ত্রিকের এইসব অসৎ উদ্দেশ্যের আলো-ছায়া।আর সেই থেকেই উপমার ভয়ের কারন। কিন্তু উপমা এখনও বুঝতেছে না কীভাবে এসব দেখছে সে? হয়তো সে এক অজানা রহস্য! হয়তো অন্ধকার কখনোও সত্যিকে লুকিয়ে রাখতে পারে না তাই। যার গর্ভে এক আশ্চর্য শক্তির সৃষ্টি হয় সে কি কিছুই অনুভব করতে পারবে না? তা কি করে হয়?
উপমার ক্ষমতাও কম ছিলো না। হয়তো সকলের চোখের আড়ালে ছিল তার ক্ষমতা।নয়তো সে এসব শক্তি ব্যবহার করার সাহসীকতা নিজের মধ্যে প্রকাশ করার সাহস করে উঠতে পারেনি।
আজ সাতদিন ধরে উপমা অন্ধকার রুমের ভিতরে বন্দি। কারোর সাথেই যোগাযোগ নেই ওর।খাওয়ার সময় খাবার নিয়ে আসে উপমার শাশুড়ী। খুবই কড়া নজরদারীতে এখন রাখে হয়েছে তাকে।যদি একবার উপমা মুক্ত হয় তাহলে সব শেষ। শেষ ওদের স্বপ্ন আর অমরত্ব লাভের অাশা!
এদিকে তান্ত্রিকের মনোভাব দেখে অমিত ও তার মা তাকে প্রবচনা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় বাড়ির কাজের লোকদের দিয়ে। কিন্তু তান্ত্রিকের তো যেভাবেই হোক প্রতিশোধ চাই। হোক সেটা নিজে কিংবা উপমা-উমার মাধ্যমে। প্রয়োজনে উপমা আর উমার সাথে হাত মেলাতেও প্রস্তুত সেই তান্ত্রিক।
স্বপ্ন সবার জীবনেই আসে। কিন্তু কারো সপ্ন আবার অন্য কারোর জন্য দুসপ্নও হয়। উমার চোখেও স্বপ্ন আসতে শুরু করেছে। সেই এক পুরোনো দিনের স্বপ্ন। অতীতে তার মায়ের সাথে আর চার আত্মার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো একে একে পরিষ্কার হচ্ছে তার কাছে। সেই সপ্নগুলোর মাঝেই মাঝরাতে ঘুম ভাঙে যায় উমার ! গুনগুন করে তার কানের কাছে ধয়ে আসছে ভয়ংকর কিছু কান্নার আওয়াজ। অমিতেরর বুকের উপর থেকে মাথা সরিয়ে চুপিসারে চলছে সে গুনগুন সে শব্দের পিছে।
অন্ধকারের মাঝেই হাটছে উমা। কেউ যেন তাকে মধ্যরাতের বিশালতায় আহ্বান করছে।
তাকে অন্য কেউ নিয়ে যাচ্ছে এ সুরের সঙ্গে। হালকা ঘুম চোখে হাটছে সে। ঘনঘটা অন্ধকারে নিজের হাত পর্যন্ত দেখা যায় না সে গুহার মাঝে। সামনেই এক জ্বলন্ত শিখা আর সে জ্বলন্ত শিখার মাঝে হালকা করে দেখা যাচ্ছে সেই অভিশপ্তদের দূর্লব দেহগুলো।
মাঘী পূর্ণিমার রাত আজ। একদিকে অমিত আর তার মায়ের সাধনার পূর্নতা লাভের রাত আজ। অন্যদিকে অভিশপ্তদের আদি বাদশাদের মুক্তি লাভের রাত আজ। এদিকে সেইদিনই তান্ত্রিক কবিরাজ নিজ বাড়ি যাওয়ার পথে……..
৭ম ও শেষ পর্বের অপেক্ষায়
অসমাপ্ত