ভালোবাসা নামক মরিচীকার গল্প- সামিউল আদনান।

IMG_20190523_034626
আমার সাথে একটু দেখা করো ইমার্জেন্সি, কিছু কথা আছে (ফোনের ওপার থেকে বলল তামান্না)
_ আচ্ছা ঠিক আছে।
আমরা যেদিনই দেখা করতাম সেইদিন বিকেল ঠিক ০৪.৩০ এ এডওয়ার্ড ভার্সিটি কলেজের ডিগ্রি ক্যাম্পাসের পুকুর পাড়ে করতাম এইটা ফিক্সড ছিলো, তাই আর নতুন করে টাইম এবং যাগয়া বলার প্রয়োজন হত না।
আমি নয়ন, তামান্নার সাথে আমার রিলেশন ৩ বছর,
আমি যখন অনার্সে প্রথম ভর্তি হয় তখন তামান্না একই ক্যাম্পাসে ইন্টার ফাস্ট ইয়ারে ভর্তি হয়।
অনেক কাহীনির পর আমরা দুজনে এক হই।
এক হওয়ার জন্য অনেক কিছু সহ্য করতে হয়ছে।
আমি এখন অনার্স থার্ড ইয়ারে ফিনান্স এন্ড ব্যাংকিং এ পড়ছি।
তানান্না অনার্স ফ্রাস্ট ইয়ার।
আমি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে।
পরিচয় দেওয়ার মত আর কিছুই নাই।
তামান্নার বাবার অনেক টাকা পয়সা আছে, শুধু তাই না, প্রভাবশালীও বটে
রিলেশন করার আগে এইগুলা জানতাম না। পরে তামান্নার থেকে কিছু শুনছি আর বাকিটা বন্ধুদের থেকে জানছি।
জানার পর থেকেই তামান্নাকে হারানোর ভয় আমাকে রোজ কুড়ে কুড়ে খেত।
অলউয়েজ ভয় পেতাম এই মনে হয় হারিয়ে ফেললাম তামান্নাকে।
তামান্না দেখতে দুধে আলতা, আর তার ব্যবহার আচার- আচরণ খুবই ভালো, নম্র ভদ্র আর ফ্রেন্ডলি বাট চুপচাপ।
ওর চোখ দুইটা দেখে আমি ত ফিদা।
দেখা করতে গেলে আমি মাঝে মাঝে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম ও আমার দিকে যখন তাকিয়ে কথা বলত তখন।
ও কথা বলেই যাচ্ছে আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আছি আনমনা।
কিছুক্ষন পরে হাতে একটা চিমটি দিয়ে বলেঃ
-কি বললাম এতক্ষন শুনেছো কিছু?
_হুম শুনলাম ত
-কি বললাম বলো ত
_তুমি বললে ” কি বললাম এতক্ষন শুনেছো কিছু?”
-উফস তোমাকে নিয়ে পারি না।
_ ভালোবাসি
– ভালোবাসি
আমি যেদিনই দেখা করতে যাইতাম, সেদিনই একটা করে সারপ্রাইজ দিতাম তামান্নাকে, দামের দিক থেকে সেটি কম হলেও ভালোবাসায় ভরপূর ছিলো সেটি
ভালোই যাচ্ছিলো আমাদের টুনা আর টুনির প্রেম
আমি কখনো তামান্নাকে কোনো বিষয়ে জোড় করতাম না।
ওর আর আমার মিল ছিলো অনেক, দুজনের চয়েজের মিলটা অনেকটাই এক ছিল।
তাই কখনো রাগারাগী হয়নি আমাদের মাঝে।
দুই একবার মান অভিমান হয়ছিলো বাট বাকিটা ওকে।
ও মাঝে মাঝে বলতঃ
-আমি হয়ত জীবনে যেকোন একটা পূর্ণ করেছি যার জন্য হয়ত উপরালা তোমার ভালোবাসা আমাকে দিয়েছে।
_আল্লাহর কাছে দোয়া করো যেনো আমাদের এইভাবেই রাখে বাকি জীবন।
আমি আর তামান্না রাত ১১.৩০ এর পর থেকে ২ টা অব্দি কথা বলতাম মেসেঞ্জারে, সেটি কলে হোক বা মেসেজ।
১১.৩০ বাজলে কেউই যেন আর ঠিক থাকতে পারতাম না। যেভাবেই হোক কথা বলতেই হবে।
১১.৩০ এর আগে তামান্না ওর ফ্রেন্ডদের সাথে আড্ডা দিত আর পড়াশুনা থাকলে করত।
বাট ১১.৩০ বাজলে ওর সব কাজ বাদ শুধু আমি আর আমি।
আর সকালে তামান্নার কাজ ঘুম থেকে উঠে-
” গুড মর্নিং ❤”

এই মেসেজটা দেওয়া।

মাঝে মাঝে পাগলামি করত
আমি খুব উপভোগ করতাম ওর এই পাগলামি গুলা, আর মিট মিট করে হাসতাম
তিন বছর রিলেশনশিপ
হঠাৎই তামান্না যেনো কেমন হয়ে যাচ্ছে
১১.৩০ বেজে পার হয়ে গেলেও অনলাইনে আসে না।
কথাও কম কম বলে সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মেসেজ আসি নাই কোনো ।
আমি হঠাৎ ওর এমন আচরনের কিছুই বুঝছি না। সারাদিনে একবারও ফোন দেয় না, আমি দিনের মধ্যে ৫ বার ফোন দিলেও রিসিভ করে না
হঠাৎ একটু রিসিভ করে কিছুক্ষন কথা বলে, তারপর বলেঃ
– আমি এখন রাখছি রাতে কথা হবে। এখন বাই।
_ হুম (মনটা খারাপ করে কল কেটে দিই)
এমন প্রায় ১০ দিন মত গেলো, তামান্না কথা বলা প্রায় বাদই দিয়ে দিছে আমার সাথে,
একবার দেখাও করি নাই এই ১০ দিনে
আমি যেন উন্মাদ হয়ে গেছি
সারাক্ষন তামান্নার ছবি বের করে দেখি
তারপর একদিন বিকেলে তামান্নাকে ফোন দিলাম দুইবার ধরলো না
আমি তামান্নার আম্মুর ফোন দিলাম, ওর আম্মুর ফোন ছোটবোন তন্নির কাছে থাকে বাসায় থাকলে। তাই ভাবলাম তন্নিকে জিজ্ঞাসা করি দেখি তামান্নার এমন বিহ্যাবের ব্যাপারে কিছু জানতে পারি কিনা।(তামান্না ক্লাস নাইনে পড়ে)
আমি বলতেই সে অস্তির এক কথায় আমার ফ্যান সে।
– হ্যালো?
_তন্নি?
-হুম, নয়ন ভাইয়া তাই না?
(আগেও তন্নি ফোনে কথা বলেছে তাই চিনতে অসুবিধা হয়নি আমার কন্ঠ।)
_হুম, কেমন আছো তুমি?
-হ্যাঁ আমি ভালো আছি ভাইয়া আপনি কেমন আছেন?
_হুম আমিও আল্লাহর রহমতে ভালো আছি আন্টি আংকেল কেমন আছে?
-হুম আব্বু আম্মুও ভালো আছে।
_আচ্ছা তন্নি তোমার আপু কই? দুইবার ফোন দিলাম রিসিভ করলো না,আর আজ দশ দিন আমার সাথে ঠিক মত কথা বলে না কল মেসেজ কিছুই দেয় না।
তোমার আপু এমন করছে কেনো তুমি কি কিছু জানো?
-ভাইয়া আপু পুরাটাই চেন্জ হয়ে গেছে আপনার কথা বললে আগে আপু মিট মিট করে হাসতো আপনার নামে দুস্টামি করে কিছু বললে রেগে যেত
আর সে এখন আপনার কথা ইদানিং সহ্য করতে পারে না।
আমি সে দিন আপনার নাম ধরে আপুকে ডাকছি সে তার জন্য আমাকে চড় মারার মত অবস্থা।
আপনাকে যেন তার এখন আর সহ্যই হয় না।
আমি নিজেই হতবাক আপুর আচরনে।
সেই সকালে আশিক ভাইয়ার সাথে বের হয়ছে এখনো বাসায় ফিরে নাই
এখন ৫ টা বাজে আমি আম্মু ফোন দিলো বলল ঘুরছে নাকি তারা।
_আশিক ভাইয়া কে?
-আমার খালাত ভাই, ঢাকাতে থাকে, বেড়াইতে আসছে আমাদের এইখানে।
_অহ
– ভাইয়া আমার মনে হয় বাবা আশিক ভাইয়ার সাথে আপুর বিয়ে ঠিক করেছে
আমার যতদূর ধারনা।আর আপুও এটাতে সম্মতি দিছে।
-অহ, তাহলে ত বড়ই ভালো নতুন দুলাভাই পাবা
_ যতই ভালো হোক না কেনো, আপনার মত কাউকে পায় না
ভাই / দুলাভাই দুইটাই হিসেবেই আপনি পারফেক্ট আমি আপনাকে দুলাভাই হিসেবে চায় আমি আব্বু আম্মুকে সব বলব
-কি বলব এখন আর?
_বলব তোমার মেয়ে এত দিন নয়ন ভাইয়ার সাথে রিলেশন করল আর এখন টাকায়ালা পেয়ে নয়ন ভাইয়াকে কষ্ট দিয়ে বিয়ে করবে তাকে।
– বাদ দাও। তোমার আপু চায় না, সেখানে আমার / তোমার কিছুই করার নাই
পরে কথা হবে এখন রাখলাম বাই
(চোখের মধ্যে পানি টপ টপ করছে)
কল কেটে দিলাম
নিজের অজান্তেই দেখি চোখ দিয়ে অঝরে পানি ঝরে যাচ্ছে
তারপর সন্ধ্যার দিকে বাইরে গিয়ে ফার্মেসি থেকে একটা ঘুমের ঔষধ নিয়ে আসলাম
খেয়ে ঘুমালাম, আম্মুকে বললামঃ
_ আমি খাবো না রাতে, শরীরটা ভালো না তাই ঘুমালাম আমাকে ডেকো না
আম্মু- আচ্ছা।
ঘুমের ঔষধ খাওয়ার কারণ হল আমি হুসে থাকলে টেনশন করব, আর তার থেকে বরং ঘুমের মাঝে কাটিয়ে দিই ১ দিন
হয়ত কিছুটা হলেও শান্তি পাবো
পরের দিন দুপুরে তামান্নার কল
রিসিভ করে কানে ধরে রাখলাম
বলল দেখা করতে ইমার্জেন্সি
গেলাম দেখা করতে
আমার আগেই গিয়ে বসে আছে তামান্না।
আমি গেলাম, আমাকে বললঃ
– বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে। আর আমি আমার বাবা মায়ের অবাধ্য হতে পারব না
তাই আমি বিয়ে করতে বাধ্য হচ্ছি
_তুমি বলতে পারতে আমার কথা তোমার বাবা মায়ের কাছে
তুমি আর ১ বছর থাকলে আমার অনার্স কমপ্লিট হয়ে যাবে তখন কোন না কোন চাকরী আমি পেয়ে যেতাম আর তখন না হয় দুজনে বিয়ে করে নিতাম
_ শুনো নয়ন, জীবনে বেঁচে থাকতে হলে টাকার কোন বিকল্প নাই। তোমার হাত ধরে আমি আমার ফিউচার নষ্ট করতে পারব না। তুমি আমাকে কি দিতে পারবা শুনি ঐ মুল্যহীন ভালোবাসা ছাড়া? কিন্তু টাকা থাকলে সব হয়। তোমার হাত ধরে আমি আমার বাবার সম্মান হানী হতে দিতে পারব না।
তোমার কাছে আসলে আমার বাস্তবতার সাথে লড়াই করা লাগবে। কিন্তু আমি সেটা কখনো করিও নাই আর করতেই চায় না।
আর বললা না কোনো না কোনো চাকরী😂😂
সেটা করে কয় টাকা পাবে তুমি?
আর সেই টাকা দিয়ে কোন দিনও তুমি আমাকে সুখে রাখতে পারবে না।
তাই বলছি নিজেকে গুছিয়ে নাও। ভালো হবে তোমার জন্যই।
জীবন আবেগ দিয়ে চলে না, ভালোবাসার কোন মুল্যই নাই।
আচ্ছা তুমি আমাকে এইটা বল তুমি এইখানে আসছো রিক্সা নিয়ে আর আমি আসছি আমার উড বি বরের প্রাইভেট কার নিয়ে, তাহলে তুমি নিজেই বলো তোমার সাথে কি আমার মিল পড়ে?
_অনেকটা হতাশ হলাম
অনেক বড় হয়ে গেছো তুমি তামান্না, অনেক কথা এখন জানো বুঝো
যাইহোক তুমি আমার ভুল ভাঙিয়ে দিছো আমি সত্যিই একটা মরিচিকার পেছনে ছুটছিলাম
তবে আমার ভালোবাসাটা ভুল ছিলো না
তুমি এখন এই গুলা বলছো তাহলে রিলেশন করছিলা কেন? তখন কেনো আমাকে স্বপ্ন দেখাইছিলা?
_ এইটাই ত আমি ভুল করেছি, আমি তোমার সাথে প্রেম করেছি আর সেটা টাইম পাস যাস্ট আর কিছুই না।
বাট এখন বিয়ে করব, সো একটু ভেবে চিন্তেই ত করতে হবে।আর বিয়ের ক্ষেত্রে কখনো নিচে নামতে নাই উপরে উঠতে হয় এইটা মাথায় রেখো
যাইহোক আমি চলে গেলাম টেক কেয়ার
চলে গেলো সে
বিয়েও করে নিল কিছু দিন পর, আমি ৫ দিন রাতে ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়েছি
আর চেতন অবস্থায় চোখের জল ফেলেছি
অনেক কষ্টে তামান্নার স্মৃতি মুছে নিজেকে শক্ত করার প্রচেষ্টা করেছি বাট বার বারই রাত ১১.৩০ বাজলে আমি যেন পাগল হয়ে যাই
You can’t reply to this conversation. learn more.
তারপরও যেন তার কনভারশন নিয়েই পড়ে থাকি যদি একটা মেসেজ দেয়
আমি কাউকে দোস দিব না, বাস্তবতাকে না টাকা কে না, দোস আমার ভাগ্যের
আমি মরিচিকার পেছনে ছুটেছিলাম সেটা এখন বুঝছি।।

কমেন্ট করুন