ভালোবাসার লাল গোলাপ – রুদ্র অয়ন।

গোধূলি লগ্নে আবীর রাঙা সূর্যটা দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে দেখে রিয়া’র বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাঁৎ করে ওঠলো৷ রিকশায় পাশে বসা রানাকে বললো, ‘অনেক দেরি হয়ে গেছে৷ এখন আমাকে বাসায় যেতে হবে৷’
রিয়া’র হাতের ওপর হাত রাখলো রানা। মৃদু স্বরে অনুনয় করে বললো, ‘আর কিছুটা সময় থাকা যায় না?’
রিয়ার হাতটা শক্ত করে ধরলো রানা। হাতটি ছাড়িয়ে নিয়ে রিয়া বললো, ‘উহু! সম্ভব না৷ দেরি হলে আম্মু খুব বকাবকি করবে।’
রানা রিয়া’র মুখ পানে তাকালো৷ বিকেলের আলোয় ওর মুখটা উজ্জ্বল দেখিয়েছিল৷ কিন্তু সন্ধ্যা লগ্নে এখন মুখখানা কেমন যেন ম্লান হয়ে আছে৷ দিকহারা চেহারায় যে হতাশা ভর করে৷ সেই হতাশা রিয়ার মুখে দেখতে পেল রানা।
বিকেলের আলোতেও রিয়া হেঁসেছে৷ বান্ধবীদের বিষয়ে গল্প করেছে৷ সিনেমার রোমাঞ্চকর কাহিনী খুব রোমাঞ্চিত হয়ে বলেছে৷ কিন্তু এখন গোধূলী লগ্নে বাড়ি ফেরার সময় সব উত্তেজনা অন্ধকারে একসাথে মিশে গেল৷
খানিকটা রাগের স্বরে রানা বললো, ‘এভাবে কত দিন চলবে? আমাদের ভালোবাসার সম্পর্কের দুই বছর চলছে৷ একান্ত করে বেশিক্ষণ পেলামনা কোনও দিন! আমি ভালো পয়সা আয় করছি৷ সরকারি চাকুরি আমার। তুমি বাসায় বলে ফেলো।’
রিয়া বোঝানোর ভঙিমায় নরম স্বরে বললো, ‘আচ্ছা হবে, কিছুদিন পরেই বলবো। বিসিএসটা কমপ্লিট হোক। তারপর বলবো কথা দিচ্ছি৷’
শরীরটা আজ তেমন ভাল লাগছেনা রিয়ার। একটুক্ষণ পরে রিয়া আবার বললো, ‘শরীরটা ভালো লাগছে না৷’
রানা রিক্সা থেকে নেমে পড়লো। মৃদুস্বরে বললো, ‘ঠিক আছে বাসা যাও তাহলে। আবার দেখা হবে।’
রিক্সাটা বাসার দিকে নিয়ে যেতে বললো রিয়া।
বাড়ির সামনে এসে রিক্সা থামলো৷ রিয়া রিক্সা থেকে নেমে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো।
রিয়া রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুমাতে যাবে এমন সময় রিয়া’র ফোন আসে।
ধ্রুব’র ফোন। নম্বার রিয়া-ই প্রথম দিয়েছিল ওকে। রিয়া যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো সেই অঞ্চলেই ধ্রুব’র বাসা। রিয়াকে খুব পছন্দ করে কিন্তু কোনদিন মুখফুটে কিছু বলেনি ধ্রুব, অনুমতিছাড়া হুটহাট কখনও ফোন করেনা সে। আজ হঠাৎ তার ফোন! না, রিসিভ করলোনা রিয়া। ধ্রুব আর ফোন দিলোনা। একটা এসএমএস করলো। তাতে লেখা, ‘খুব অস্থির লাগছে, অনুমতি না নিয়েই ফোন দিয়েছিলাম। আপনি ভাল আছেনতো? শরীর কেমন আছে আপনার?’
রিয়া রিপ্লাই দিলো, ‘আমি ভালো আছি।’
ইদানিং ধ্রুবকে একদম পছন্দ হয়না রিয়ার। ধ্রুব দেখতে শুনতে খারাপ না তবে রাণার মত হাই সোসাইটির নয়। রাণার মত সরকারি চাকুরিজীবিও নয়। পাবলিক জব করে। অবশ্য সে যে বিরক্ত করে তা নয়। কোনও কারণে রিয়া কান্না করলে ধ্রুব’র মন নাকি ভাল থাকেনা! অসুস্থ থাকলে অনুমতি দিলে প্রয়োজনে রিয়াকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চায় বলে মতামত জানায় ধ্রুব। পরিবারে কারোও সাথে মনোমালিন্য, ভুলবোঝাবুঝি কিছু হলে তাদের এককরে দেয়ার, মিলমিশ করে দেয়ার মতামত জানায়। বাবা মা কষ্ট করে মানুষ করেছেন, লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করেছেন, তাঁরা কষ্ট পান এমন কিছু করতে নিষেধ করে। বাবা মায়ের জন্যে হলেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করতে বলে আর সব সময় ভাল থাকার কথা বলে রিয়াকে ধ্রুব। অবশ্য সে কখনও কোনও বিরক্তিকর কিছু বলেনা আর কোনও স্বার্থ নিয়ে কথাও বলেনা তবু রিয়ার অসহ্য লাগে ধ্রুবকে!
হঠাৎ কি মনে করে ফোনটা তুলে ধ্রুবকে ফোন দেয় সে।
ধ্রুব ফোন রিসিভ করে, ‘হ্যালো… ‘
রিয়া চড়া গলায় বলে, ‘আমার পেছনে দৌড়াদৌড়ি করা আমার থেকে দু’ পয়সা পাত্তা না পাওয়া পাবলিক আমাকে কখনও ফোন দিবিনা।’
বিষন্ন কণ্ঠে প্রতুত্তর শোনা গেলো – ‘আমিতো জীবনে কোনও দিন আপনার পেছনে দৌড়াইনি। কখনও বলিনাই আমাকে ভালবাসুন। আমি বন্ধু হিসেবে আপনার প্রয়োজন অপ্রয়োজনে পাশে থাকতে চেয়েছি। অবশ্য আপনার মন খারাপের দিনে, অসময়ে পাশে থাকার অভিপ্রায় আমার। আপনার সুখে, সুসময়ে আপনার থেকে দূরেই থাকতে চাই। আজ যে কথা আপনি আমাকে বললেন, কোনদিন আর আপনার সাথে যোগাযোগ রাখবোনা। ভাল থাকবেন।’ ফোন কেটে দিল ধ্রুব।
যাক মনে মনে রিয়া ভাবলো আপদ দূর হয়েছে, ভাল হলো।
মা হঠাৎ এসে রিয়ার কপালে হাত রাখলো।
উৎকণ্ঠার স্বরে বললো, ‘জ্বরতো দেখছি অনেক৷ মুখটাও তো শুকনো লাগছে!’
হাতের দিকে তাকিয়ে মা বললেন, ‘তোমার হাতের কনুইয়ের উপরে ঐটা কিসের দাগ? দেখে মনে হচ্ছে রক্ত জমে আছে!’
হাত ঘুরিয়ে সেই জায়গাটা দেখলো রিয়া ৷ এমন গোল হয়ে রক্ত জমে আছে সেটি আগে খেয়াল করেনি সে নিজেই ৷ ভালো করে দেখে বললো, ‘হয়তো রিক্সার সাথে লেগে এমন হয়েছে৷’
মা বললেন, ‘ক্ষত জায়গাতে খানিকটা বরফ ঘষলে ঠিক হওয়ার কথা৷ আমি ফ্রিজ থেকে বরফ নিয়ে আসছি৷’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে রান্না ঘরের দিকে গেলেন মা।’
মায়ের এমন যত্ন আজ নতুন নয়। এত রাগ দেখায়, কারণে অকারণে এত কথা শোনায় তারপরও সন্তানের প্রতি মায়ের যত্নটা এমনই। মায়েরা এমনই হয়! সব সন্তানেরা বাবা মায়ের স্নেহ মমতা ভালবাসার যদি মূল্যায়ন করতে পারতো…।
কিছুক্ষণের মধ্যে মা বরফ নিয়ে এসে ক্ষতস্থানে চেপে ধরলেন। বেশ কিছু সময় বরফ ধরার পর গলে যাওয়া অবশিষ্ট বরফ রেখে শাড়ির আঁচলে ভেজা হাতটা মুছে রিয়ার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। এক সময় রিয়া শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।
সকালে হাত মুখ ধুয়ে রিয়া পড়নের জামা পরিবর্তন করার সময় দেখলো ওর বুকেও রক্ত জমে গোল হয়ে আছে! মনে হয় এলার্জির সমস্যা৷ এ্যালাটল ট্যাবলেট খেলে ঠিক হয়ে যাবে। সপ্তাহ খানেক ধরে রিয়ার শরীরের অবস্থা ক্রমশই খারাপের দিকে যাচ্ছে৷ ক্ষণে ক্ষণে ফ্লু হচ্ছে৷ প্রায় প্রতিদিনই জ্বর রয়েছে৷ শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত জমে জমে গেছে!
মেয়ের এমন অবস্থা দেখে রিয়ার আব্বু অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যায় নিয়ে গেছে পিজি হাসপাতালে৷ ডাক্তার রিয়াকে দেখে, রক্ত পরীক্ষা করিয়ে বললেন, ‘ব্লাড ক্যান্সার৷’ ক্যান্সার কথাটি রিয়ার বাবাকে একা ডেকে বলেছেন।
কথাটা শুনে রিয়ার বাবার বুকে যেন বিশাল এক ভূমিকম্প হলো। যেন ভেঙে পরে জীবনের ভেতর গড়া স্বপ্ন বাড়ির খুঁটি৷
ডাক্তার রিয়ার বাবাকে চুপ থাকতে দেখে বললেন, ‘কি ভাবছেন?’
—’ভাবছি এর ভবিষ্যৎ!’
ডাক্তার নীরব ভঙিতে চোখ থেকে চশমা খুলে টেবিলের উপর রাখলেন৷ সামনে রাখা পানির বোতল থেকে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে বললেন, ‘শুনুন৷ সব কিছুই জয় করা সম্ভব৷ মনের শক্তি, টাকার শক্তি, ভালোবাসার শক্তি৷ এই তিন শক্তি দ্বারা গোটা দুনিয়া জয় করা সম্ভব৷’
ক্ষণকাল নিরব থেকে ডাক্তার আবার বললেন, ‘চিকিৎসা করাতে থাকুন৷ সৃষ্টিকর্তার কৃপায় মিরাক্কেল ঘটলেও ঘটতে পারে ৷’
‘হুম৷’ বললেন রিয়া আব্বু।
ডাক্তার বললেন, ‘ঔষুধ দিচ্ছি৷ আর কেমোথেরাপি চালিয়ে যাবেন৷’
রিয়ার আব্বু ডাক্তারের সামনে থেকে ওঠে এসে দরজা দিয়ে বের হতেই দেখলো দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে রিয়া ৷ বাবাকে দেখে বলল, ‘ডাক্তার কি বললেন আব্বু?’
বাবার চোখে পানি জমে গেল৷ ওর মনে হচ্ছে পদ্মা মেঘনা বাঁধ সেধেছে দু’চোখের কোণে! এই মুহূর্তে পিতার মনে হলো, পৃথিবীতে সব চেয়ে কষ্টের কাজ হচ্ছে চোখের পানি আটকে রাখা৷ কষ্ট হলেও তবু যতটা সম্ভব অশ্রু সংবরন করে চেপে ধরে রেখে রিয়াকে বললেন, ‘বাসায় গিয়ে বলছি ৷’
বাসায় এসে বাবা সরাসরি বাথরুমে ঢুকলেন। পানির কল ছেড়ে দিলেন সেই সাথে যেন ছেড়ে দিল চোখের পানিকে বাধা দেয়া বাধ!
ঘরে পড়ার টেবিল চেয়ারের
ওপর বসে আছে রিয়া। রানাকে ফোন দিলো।
ফোন রিসিভ করে রানা জিজ্ঞেস করলো, ‘ডাক্তার কি বলেছে?’
—’আমাকে বলেনি৷ আব্বুকে ডেকে কি সব যেন বলেছেন৷’
—’তুমি শোননি কি বলেছে?’
রিয়া দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনলেও তা রানাকে বলার প্রয়োজন মনে করছেনা৷ তাই বলল, ‘বাবা কিছু বলেনিতো৷ হয়তো ছোট খাটো কোন ইস্যু৷ চিন্তা করো না৷’
__ ওহ। আমরা কালকে মিট করবো ঠিক আছে? সারাদিন এক সাথে থাকবো হাতে সময় নিয়ে এসো কিন্তু । সন্ধ্যারপর বাড়ি ফিরবে।’
– না, শরীরটা ভাললাগছেনা। কাল দেখা যদিও করি বেশিক্ষণ সময় দিতে পারবোনা।
– কেন? কি হয়েছে বলতো?
—’আসলে ছোট ইস্যু না রানা৷ ক্যান্সার হয়েছে৷ ব্লাড ক্যান্সার৷’
রানার মনে হল কেউ ওর কানের সামনে পর পর কয়েকটি বোমা ফাটিয়েছে৷ যার কারনে কান স্তব্ধ হয়ে গেছে৷ কিছুই শুনতে পায়নি৷ আবার জিজ্ঞাসা করলো, ‘কি বললে?’
—’ঠিক শুনেছো৷’
কিছুক্ষণ নীরব থেকে কাঁপা কাঁপা স্বরে রানা বললো,’এটি তেমন কিছু না৷ আমার এক দূর সম্পর্কের খালার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছিল৷ কেমোথেরাপি, এই-সেই কত কিছু করে ভালো হয়েছে৷ সিঙ্গাপুরে গিয়েও চিকিৎসা করিয়েছিলো৷ খানিকটা টাকা খরচ হয়৷ এই যা।’ কথাগুলো বলে একটু দম নিলো রানা। আর কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেল না ৷ বাস্তবতার সামনে সব ভাষা, সব আবেগ যেন দিশাহারা হয়ে হারিয়ে গেল।
রিয়ার বুঝতে কষ্ট হলো না যে এই মুহূর্তে রানার বলার কিছুই নেই৷ কি আর বা বলবে৷ সান্তনা দেবে৷
ফোন কল কেটে দিল রিয়া। শুয়ে পড়লো বিছানায়৷ ওর শরীর খুব খারাপ লাগছে৷
কয়েকদিন অতিবাহিত হলো। রিয়ার বাবা রিয়াকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাবার জন্যে সমস্ত টাকা পয়সা যোগার করে ফেললেন। অবশ্য এ বিষয়ে রিয়ার এক বন্ধু পরিচয় দানকারী ব্যক্তি রিয়ার বাবাকে অনেক সাহায্য সহযোগিতা করেছে। তবে আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে রিয়াকে এসব না বলতে অনুরোধ জানিয়ে সেই ছেলেটা!
বাবা রিয়াকে সিঙ্গাপুর নিয়ে গেলেন। সেখানকার অভিজ্ঞ ডাক্তার ভাল করে পরীক্ষা নিরিক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে জানালেন আসলে ক্যান্সার হয়নি। কিছু এ্যালার্জিজনিত সমস্যা, রক্তে কিছুটা ইফেক্ট হয়েছে সেটা ওষুধেই সেরে যাবে। আর কিছুদিন ভুল ঐষধ সেবন ও রোগীর মানষিক চাপে শরীরটাও ভেঙে গেছে। চিন্তার কিছু নেই। ওষুধে ঠিক সুস্থ হয়ে ওঠবে।
ডাক্তারের মুখে এসব কথা শুনে মনোবল ভেঙে হতাশ হয়ে পড়া রিয়া যেন প্রাণে শক্তির সঞ্চার পেলো। ওরা দেশে ফিরে এলো।
মাস খানেক পেরিয়েছে৷ এখন অনেকটা সুস্থ রিয়া। রানার সাথে রিয়ার যোগাযোগ এতদিন ধরে বিচ্ছিন্ন। আজ একটা অবাক করা খবর জানতে পারে রিয়া। ফেসবুক ব্রাউজ করছিল, পাশে বাবা বসেছিলেন। ধ্রুব’র ছবি প্রোফাইলে আসতেই বাবা সেদিকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘তোমার বন্ধু’র ছবি না?’
রিয়া কিছুটা বিব্রত কণ্ঠে বলে, ‘কোথাকার কে দু’পয়সা পাত্তা না পাওয়া পাবলিক আমার বন্ধু হতে যাবে কেন!’
বাবা ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, ‘মা, ঐ ছেলেটাই তোমার চিকিৎসার জন্যে সিঙ্গাপুর যেতে অনেক সহযোগিতা করেছে। আমাকে সিঙ্গাপুরের ভাল ডাক্তারের তথ্য, যাতায়াত, চিকিৎসা খরচের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে দেয়া ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কাছে একজন মেধাবী ছাত্রীর চিকিৎসা খরচের আর্তি জানিয়ে আর্থিক সহযোগিতা পাইয়ে দেয়াটাতেও তার অবদান ছিল। আর তাই এত তারাতাড়ি সিঙ্গাপুর যাওয়া সম্ভব হয়েছিল আমাদের। একান্ত নিষেধ থাকায় সে সময় এসব কথা বলতে পারিনি। আমার মনে হয় ছেলেটা খারাপ নয় মা।’
এসব কথা শুনে চমকে ওঠেছে রিয়া! দুই বছর ধরে রানার যেই ভালোবাসা দেখেছিলো সে ৷ অসুস্থতার কথা জানানোর পরে পরবর্তী সময়ে তার ছিটে ফোটাও ভালবাসা দেখেনি৷ এ কারনে ওর মনে আফসোস বা কষ্ট আসেনি৷ কারন রিয়া এই সময়ে বুঝতে পেয়েছে বাবা মা নামক পৃথিবীর সত্যিকারের ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা কাকে বলে। দেখতে পেয়েছে বাবা মা নামের সম্পর্কের এক অদ্ভুত টান৷ আর এখন জানতে পারলো সত্যিকার ভালবাসা কাকে বলে।
রিয়া মনে মনে অনুশোচনা করতে লাগলো। এতটা অপমান করে যাকে দূরদূর ছাইছাই করেছে সেই কি না বিপদে নিরবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে!
আজ লাল পাড়ের হলুদ শাড়ি পড়েছে রিয়া ৷ শ্যাম্পু করা অবিন্যস্ত এলোকেশ। রৌদ্রজ্জ্বল দিনে বাইরে ঝক ঝকে পরিবেশের ঘরের সব জানালা খুলে রেখেছে৷
ধ্রুব’র কথা খুব মনে পড়ছে রিয়ার। ফোন দিলে সে কি রিসিভ করবে? মনের এলোমেলো ভাবনার মাঝেই ফোন দিয়ে বসলো ধ্রুবকে।
অপরপ্রান্ত থেকে ফোন রিসিভ করে ‘হ্যালো’ বললেই রিয়া কাঁপাকাঁপা স্বরে বললো, ‘সরি’
– ‘সরি কিসের জন্যে? দু’পয়সা পাত্তা না পাওয়া রাস্তার ছেলেকে সরি বলতে হয়না ম্যাডাম।’
– ‘ঠিক আছে, আমি কবেই ক্ষমা করে দিয়েছি কিন্তু সেসব অপমান অবজ্ঞা জনক আচরণ আমি ভুলিনি। আর যেহেতু ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে সেহেতু বারবার সরি বলার প্রয়োজন নেই। ভাল থাকবেন।’ ফোন কল কেটে দিতে উদ্ধত হলে রিয়া তড়িঘড়ি করে বলতে লাগলো, ‘থামুন, প্লিজ ফোন রাখবেননা। আপনাকে ছাড়া আমি ভাল থাকতে পারবোনা।’
– ‘একি বলছেন আপনি! আপনার চোখে এতটা অপছন্দের আমি কি করে আপনার ভাল থাকার কারণ হলাম বুঝতে পারছিনা, আর বুঝতেও চাইনা। আপনি ভুল করছেন!’
– ‘কোনও ভুল হচ্ছেনা ধ্রুব। সন্ধ্যায় তুমি বাসায় আসবে। কথা আছে।’
– ‘কথা আছে, আমার সাথে! একি বলছেন আপনি!’
– ‘ঠিক বলছি।’
– ‘আজ সন্ধ্যায় যাওয়া সম্ভব নয়।’
রিয়া বুঝলো অভিমানী ধ্রুব এত তারাতাড়ি মানবেনা। রিয়া বললো, ‘আগামী কাল শুক্রবার। ছুটির দিন। সকাল দশটার দিকে কোথায় থাকবে বলো?’

– ‘দেখা করাটা কি খুব জরুরি?’

– ‘হুম।’
– ‘ঠিক আছে, ধানমন্ডি লেকের কাছাকাছি থাকবো।’
– ‘ওকে, সাক্ষাতে কথা হবে। এখন তবে রাখি?’
– ‘আচ্ছা।’
কথা শেষ করে ফোন রেখে দিল রিয়া।
আজ লাল পাড়ের হলুদ শাড়ি পড়েছে রিয়া ৷ শ্যাম্পু করা অবিন্যস্ত এলোকেশ। রৌদ্রজ্জ্বল দিনে বাইরে ঝক ঝকে পরিবেশের ঘরের সব জানালা খুলে রেখেছে৷ দশটা বাজতে তখন অনেকটা বাকি। রিয়া বের হলো। ধানমন্ডি লেকের কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়লো ধ্রুব লেকের পাশে কফি শপে পত্রিকা হাতে বসে অপেক্ষা করছে। কাছে এসে পাশের সিটে বসলো রিয়া।
রিয়াকে দেখে ধ্রুব অবাক স্বরে বললো, ‘বাহ! আজ দেখছি আমার পাশে স্বর্গের এক পরী এসেছে৷’
রিয়া বলল, ‘সুন্দর লাগছে?’
ধ্রুব বললো, ‘তোমার এই সৌন্দর্যের বর্ণনা করার যোগ্যতা আমার নেই।’
– ‘যারা যোগ্য তারাই নিজেকে যোগ্য নয় বলে প্রকাশ করে।’
– ‘আজ হঠাৎ এত সুন্দর করে সেজে কাছে এলে যে?’
– ‘তোমাকে একটি কথা বলার আছে৷ তাই ভাবলাম তোমার মন মত করে সেজেই কথাটা বলি৷’
– ‘আচ্ছা৷ তবে বলো শুনি৷’
রিয়া ধ্রুব’র হাত টেনে নিলো নিজের হাতের ওপর৷ তারপর বললো, ‘তোমার কাছে কোন কিছু না বলাটাই আমার ভুল ছিল৷ সেই ভুল কাল হয়ে দাঁড়ালো৷ তবে বিধাতা মানুষকে কিছু সময়ের মাঝে ফেলে দেয় কিছু সত্য বোঝার জন্য, দেখার জন্য৷ ভালোবাসা কি, তাই হয়তো বোঝানোর জন্য বিধাতা আমাকে এমন সময়ে ফেলেছিলেন। আমার প্রতি তোমার যে ভালোবাসা, আমার গোটা জীবনেও এমন কল্পনা করিনি৷ আর এমন ভালোবাসা পাব যে, সেই আশাটুকু ছিল না৷ তোমাকে একটি কথা আমি কখনো বলিনি৷ তা হলো তোমাকে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলেছি ধ্রুব ৷’
রিয়ার মুখ থেকে এই কথাগুলো শুনে ধ্রুব’র খুব আনন্দ হচ্ছে৷ ক্ষনিকের জন্য এত দিনের সব কষ্ট ভুলে গেল৷ আনন্দের রেশে তখন রিয়াকে বলে ফেললো, ‘আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি রিয়া…।’
রিয়া হাত দিয়ে ধ্রুব’র মুখে বাধা দিয়ে বললো, ‘এভাবে না৷ আমার ইচ্ছে এক গুচ্ছ লাল গোলাপ দিয়ে কথাটি বলবে৷’
ধ্রুব যেন এই মুহূর্তে আবেগী প্রেমিকের মত হয়ে গেলো৷ উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বললো, ‘ আমি এখনই গোলাপ নিয়ে আসছি৷’ বলেই বেরিয়ে গেল৷ ধ্রুব’র আনন্দ দেখে মুচকি হাসলো রিয়া ৷
কিছু সময়ের মধ্যে এক গুচ্ছ গোলাপ নিয়ে ফিরলো ধ্রুব ৷ চারদিকের পরিবেশ যেন আনন্দময়, যেন স্বর্গীয় হয়ে ওঠেছে! রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘দেখো এনেছি৷’

রিয়ার হাতে লাল গোলাপ
গুলো তুলে দিলো ধ্রুব। রিয়া একহাতে গোলাপ অন্য হাতে ধ্রুব’র হাত ধরে রইলো। নয়নে নয়ন রেখে চোখের ভাষায় একে অন্যের মাঝে হারিয়ে গেলো।

– রুদ্র অয়ন
ঢাকা, বাংলাদেশ