মানবিক গুণাবলিতে অনন্য হযরত মুহাম্মদ (সা.)

মানবিক গুণাবলিতে অনন্য হযরত মুহাম্মদ (সা.)

মানবিক গুণাবলীতে অনন্য হযরত মুহাম্মদ (সা.)
পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হযরত মুহম্মদ সা.। শুধু মুসলিমদের কাছেই নন, অমুসলিমরাও অকপটে মেনে নিয়েছেন তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব। তিনি তার উত্তম গুণাবলী দিয়ে পৃথিবীর সকল মানুষের মনে চিরভাস্বর হয়ে আছেন। তাঁর চরিত্র সকল উত্তম গুণাবলীর সমন্বয়ে গঠিত। তিনি সেই মহামানব, যার জনপ্রিয়তা কখনো ম্রিয়মান হয়নি, বরং বেড়েই চলছে উত্তরোত্তর।

 

মানবিক গুণ কি?
‘এমন জীবন করিবে গঠন,
মরিয়াও হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।’
কবিতাংশে বলা হয়েছে উত্তম মানবীয় গুণাবলিতে পরিপূর্ণ জীবনের কথা। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ তার কাজে-কর্মেও শ্রেষ্ঠ হওয়ার জন্য যে গুণাবলীর অত্যন্ত প্রয়োজন, তা-ই হলো মানবিক গুণাবলী। এ গুণগুলো থাকলে মানুষ হয় সোনার মানুষ, আর না থাকলে হয় জঘন্য ও নীচাশয় জীব।

 

মানবিক গুণাবলিতে রাসূল সা.:
প্রাতঃস্মরণীয় মনিষী, যাঁর উপর প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ দরুদ পাঠ করে, সেই প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সা. ছিলেন অভূতপূর্ব মানবীয় গুণাবলীর আঁকর। এমন কোনো সদগুণ নেই, যা তাঁর শুভ্রচরিত্রে বিদ্যমান ছিলো না। স্বয়ং মহান আল্লাহ তাঁকে সনদ দিয়েছেন,

 

‘নিঃসন্দেহে আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী, মহান আখলাকের অধিকারী।’
সততা:
নবুওতের পূর্ব থেকেই রাসূল সা. এর সততা ও সত্যবাদিতা সমগ্র আরবে প্রসিদ্ধ ছিলো। যখন তিনি সাফা পাহাড়ের উপর উঠে লোকদিগকে আহ্বান করেন এবং বলেন যে,
আমি যদি তোমাদের বলি যে, একটি শত্রুদল এই পাহাড়ের ওপার থেকে তোমাদের উপর আক্রমণ করবে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে?”
তারা সকলে বলেছিলো, “আমরা আপনাকে কখনো মিথ্যা বলতে দেখিনি।”
নবুওয়াতের পরও রাসূল সা. এর শত্রুরাও তাঁকে সত্যবাদী হিসেবে জানতেন, তাঁর সততার জন্য তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন।

 

বিশ্বাসযোগ্যতা:
নবুওতের দাবি ঘোষণার পরও মক্কার লোকজন রাসূল সা. এর নিকট তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র রাখতেন, এতেই বোঝা যায় রাসূল সা. কতটা বিশ্বস্ত ছিলেন। হাজরে আসওয়াদ নিয়ে সংঘর্ষে যখন রাসূল সা. এর সমাধান সকলে বিনাবাক্যে মেনে নিলো, তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার বিন্দুমাত্র অবকাশ থাকলো না আর।

 

দয়া:
আল্লাহ বলেন,
“আমরা কেবল তোমাকে বিশ্বজগতের জন্য দয়া ও অনুগ্রহস্বরূপ প্রেরণ করেছি।”
তিনি রুক্ষস্বভাবের পরিবর্তে ছিলেন দয়ার্দ্র চিত্তের অধিকারী। তাঁকে আঘাতে রক্তাক্ত করে ফেলা হলেও তিনি তাদের কখনো অভিশাপ দেননি, দয়ার নবী অবুঝদের বুঝদানের জন্য দোয়া করেছেন।

 

বিনয়:
বিনয় গুণটি মাথার মুকুট। সায়্যিদুল মুরসালীন সা. এর বিনয় ছিলো সর্বজনপ্রসিদ্ধ। তিনি বিশ্বজাহানের সর্দার হয়েও সাধারণভাবে থাকতেন। যখন মসজিদে থাকতেন সাহাবায়ে কেরামের সাথে এমনভাবে বসতেন যে, অপরিচিত কেউ এলে জিজ্ঞেস করতে হত- তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে? (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩)

 

সহমর্মিতা:
মুমিন ভাইয়ের দুঃখ-দুর্দশায় সহমর্মিতার হাত বাড়ানোকে রাসূল সা. রাত জেগে নফল ইবাদাতের সমতুল্য বলেছেন। তিনি নিজেও যখনই শুনতেন কেউ কষ্টে আছে, তার কষ্ট দূর না করা পর্যন্ত তিনি স্থির হয়ে বসতেন না। তিনি বলেন,
‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ-খবর নাও, বস্ত্রহীন লোকদের বস্ত্র দাও এবং বন্দিকে মুক্ত করে দাও।’ (বোখারি, হাদিস : ২৪১৭)।

 

দানশীলতা:
রাসূল সা. ছিলেন মানুষের মধ্যে অধিকতর দানশীল। জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন,
“রাসূলুল্লাহ সা. এর নিকট কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনো না বলতেন না।” তাঁর নিকট থেকে কোনো অভাবী কখনো ফিরে যায়নি। আব্বাস রা. বলেন, ” নিঃসন্দেহে রাসূল সা. মুক্ত বায়ুর চেয়ে অধিক দানশীল ছিলেন।”

 

ন্যায়বিচার:
রাসূলুল্লাহ সা. ছিলেন শ্রেষ্ঠ ন্যায়বিচারক। তাঁর ন্যায়বিচারের কারণেই সান’আ থেকে হাজরা মাউত পর্যন্ত সুন্দরী নারীরা একাকিনী দিনে রাতে পথ চলেছেন। অথচ কোন লম্পটের সাহস হতো না কোন নারীর দিকে চোখ তুলে তাকাবার। তিনি ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে কখনো নিজ পরিবার, সাহাবী, আত্মীয়-বন্ধুদের মধ্যে পার্থক্য করেননি।

 

লজ্জাশীলতা:
আমাদের শ্রেষ্ঠ আদর্শ রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিক লাজুক ছিলেন। যখন তিনি লজ্জা পেতেন, ফুটন্ত গোলাপের মতো লাল হয়ে যেতেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) গৃহবাসিনী পর্দানশিন কুমারীদের চেয়েও বেশি লজ্জাশীল ছিলেন। বস্তুতঃ লজ্জাশীলতা মুমিনের ভূষণ।

 

ক্ষমা:
রাসূল সা. অবলীলায় তাঁর চিরশত্রুকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন। ক্ষমাশীলতা তাঁর চরিত্রের অন্যতম একটি গুণ ছিলো। তায়েফবাসীরা যখন রাসূল সা. এর সত্যের আহ্বানের বিনিময়ে আঘাতে জর্জরিত করে দিলো, তখন জিবরাইল(আ.) এসে বললেন, আপনি হুকুম দিন! তায়েফের দুপাশের পাহাড় এক করে দিয়ে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করে দিই। কিন্তু রাসূল (সা.) কী বললেন? না! আমি বদদোয়ার জন্য প্রেরিত হইনি। আমি রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। অবলীলায় ক্ষমা করে দিলেন ওই জঘন্য অমানুষগুলোকে। একারণেই তাকে বলা হয়েছে আদর্শের মূর্তপ্রতীক।

 

ধৈর্য :
যেকোনো পরিস্থিতিতে সর্বদা আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া, তার সিদ্ধান্তের কারণে হা-হুতাশ না করা, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রেখে সুদিনের জন্য অপেক্ষা করার নামই ধৈর্য।
রাসুল (সাঃ) ইসলামের দাওয়াতকে ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করতে গিয়ে কুরাইশদের কাছ থেকে অমানুষিকভাবে অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে ধৈর্যধারণ করেছেন। তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন দুঃখের বছর, যুদ্ধক্ষেত্র, ইহুদীদের ষড়যন্ত্র, ক্ষুধা ও অন্যান্য পরিস্থিতিতে। কোন ষড়যন্ত্রই তাকে দুর্বল করতে পারেনি এবং কোন পক্ষই তাকে টলাতে পারেনি।

 

সহনশীলতা:
অপছন্দের কাজ বা পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেও ধৈর্যের সঙ্গে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাই সহনশীলতা। নবীজী সা. ছিলেন সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক। নবুওতের দাবির জন্য তাঁকে ভোগ করতে হয়েছে অবর্ণনীয় কষ্ট। তবুও তিনি কখনো আল্লাহর কাছে অভিযোগ করেননি। তাঁর সহনশীলতা ছিলো পর্বতের ন্যায় অটল।

 

উত্তম আচরণ:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি কাজ মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। তিনি ছোট-বড়, উঁচু-নিচু, ধনী-গরিব, শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সকলের সাথেই ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতেন। এমনকি শত্রুর সাথেও অন্যায় আচরণের বদলে ভালো ব্যবহার করতেন। রাসূল সা. এর নির্দেশে সাহাবিরা যুদ্ধবন্দিদের ভালো খাবার খেতে দিয়ে নিজেরা সাধারণ খাবার খেতেন।

 

পরমতসহিষ্ণুতা :
রাসূল সা. এর অন্যান্য নান্দনিক গুণাবলির মধ্যে অন্যতম গুণ হলো পরমতসহিষ্ণুতা। তিনি সকলের মতকে সম্মান করতেন এবং অধিকাংশের মত তাঁর বিপক্ষে গেলে তিনি সেই মতকেই মেনে নিতেন।
ওহুদের যুদ্ধে মহানবী সা:-এর মত ছিল মদীনা শহরের অভ্যন্তরে অবস্থান করে শত্রুর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। কিন্তু হযরত হামযা রা: এবং অপেক্ষাকৃত যুবক সাহাবিগণ শহরের বাইরে কোনো উন্মুক্ত প্রান্তরে গিয়ে যুদ্ধ করার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ সা: তাদের মতামত গ্রহণ করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এমন আরো বহু ঘটনায় তাঁর পরমতসহিষ্ণুতা প্রকাশ পায়।

 

বিশ্লেষণ:
রাসূলুল্লাহ সা. এর যাবতীয় মানবিক গুণাবলী বিশ্লেষণ করলে বলা যায় যে, তিনি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। মুসলিমগণ তো বটেই, অন্য ধর্মের বিজ্ঞজনেরাও এ বিষয়ে একমত।
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেন, “মুহাম্মাদ (সা) আরব বাসীদের ঐক্যের সবক দিয়েছেন। অল্প কিছু দিনের ভেতর তাঁর অনুসারী উম্মত বিশ্বের অর্ধেকের চেয়েও বেশি অংশ জয় করে ফেলে। এ বিস্ময়কর সাফল্য মুহাম্মাদ (সা.) এর শিক্ষা ও তার ওপর আমল করার কারণেরই সূচিত হয়েছে। “

 

জর্জ বার্নার্ড শ বলেন, “আমি মুহাম্মাদ (সা) সম্পর্কে অধ্যয়ন করেছি। আমার বিশ্বাস তাঁকে মানব জাতির ত্রাণকর্তা বলাই যথাযথ হবে। “
মহাত্মা গান্ধী বলেন, “প্রতীচ্য যখন গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত, প্রাচ্যের আকাশে তখন উদিত হলো এক উজ্বল নক্ষত্র এবং আর্ত পৃথিবীকে তা দিলো আলো ও স্বস্তি। ইসলাম একটি সত্য ও ন্যায়ের ধর্ম।”

 

রাসূলুল্লাহ সা. এমন একজন মানুষ ছিলেন, যার চরিত্রে না ছিলো কোনো কালিমা, না ছিলো কোনো অহংকার। তাঁর উপমা তিনি নিজেই। আল্লাহ আমাদের প্রিয়নবী সা. এর আদর্শ নিজ জীবনে ধারণ করার তাওফিক দান করুন, আমিন।

 

(তথ্যসূত্র: মাসিক আল কাউসার, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক কালের কণ্ঠ)
Headlines
error: আপনি আমাদের লেখা কপি করতে পারবেন নাহ। Email: Info@mirchapter.com
google.com, pub-4867330178459472, DIRECT, f08c47fec0942fa0