কর্পোরেট জগত ও খট্টাঙ্গ পূরাণ- ওয়ালিদ


[ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে পড়লে আপনি কিছুটা হলেও রস আস্বাদন করতে পারবেন।]

বয়ে চলা কর্পোরেট কপোট্রনিক নগর সভ্যতায় ব্রান্ডিং, সেলফী, সেলফ মার্কেটিং এবং মেনটরিং এর ঝড় দেখে মাঝে মাঝে ভয় হয়। ভয় হয় পিছিয়ে পড়ার। ভয় হয় তলিয়ে যাবার। স্বাভাবিক। আপনি যদি দেখেন, আপনার সব ইয়ার বন্ধু বান্ধব ও সামাজিক প্রতিবেশীরা শনৈশনৈ গতিতে সমাজের সব পদ পোস্ট বাগিয়ে, একেকজন কেউকেটা হয়ে বসেছেন, তাতে আপনার গান্ধিজীর সমান সংযমও টলে যেতে বাধ্য। তবে আপনার মতো হতভাগাদের জন্য সান্তনাও আছে। “আগে গেলে বাঘে খায়, পিছে গেলে সোনা পায়।” মস্করা বাদ। এবার কিছু কাজের কথা শুনুন।

গোপাল ভাঁড়ের ভাতিজার বিয়ের কথা চলছে। কণেপক্ষ ছেলে দেখতে এসেছেন। পাত্র গন্ডমূর্খ। তো পাত্রের রূপ, বংশ, পসার দেখা শেষ। হঠাৎ করে একজন মুরব্বী জিজ্ঞেস করে বসেন, “তা বাবা তুমি লিখতে পড়তে পারো?”
”আজ্ঞে, দাগিয়ে দিলে পারি।” [হালকা করে মার্ক করে দিলে, তার ওপর দিয়ে হাত ঘোরানো।]
কণেপক্ষ তো উঠে হাঁটা ধরলেন পাত্রের জ্ঞানের বহর দেখে।
গোপাল পেছন হতে চিৎকার করে বলতে লাগল, “দাগিয়ে দিয়ে দেখতি, ভাতিজা আমার কেমন দিগগজ। দাগিয়েই তো দেখাতে পারলি না।” আরেকবার।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে জব্দ করার জন্য একবার মুর্শিদাবাদের নবাব তাকে একটা অদ্ভুৎ প্রশ্ন করে বসলেন যার কোনো মাথামুন্ডু নেই। প্রশ্নটা হল, “পৃথিবীর ভূত, ভবিষ্যত বলে দিতে হবে।” গোপাল রাজাকে আশ্বস্ত করল। তো গোপাল নির্দিষ্ট দিনে নবাবের দরবারে একটা বিশাল পুটলি করা জিনিস ঘাড়ে নিয়ে ঢুকল। লাল ও সবুজ শালু কাপড়ে মোড়ানো সেই পুটলী। তো নবাব তাকে একটা প্রশ্ন করেন, গোপাল সেই পুটলীর এক পরত শালু কাপড় সরায় আর প্রশ্নের একটা জবাব দেয়। এভাবে এক এক করে সে সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে বসল। নবাব তো মহাখুশি হয়ে তাকে প্রচুর ইনাম দিলেন। তো, সেখান থেকে ফিরলে রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ওই পুটলীর ভেতরে কীভাবে প্রশ্নের উত্তর এলো। জবাবে গোপাল বলল, “আসলে ওটা ছিল খট্টাঙ্গ পূরান।” সভায় কেউ, এমনকি রাজপন্ডিতও কখনো খট্টাঙ্গ পূরানের নাম শোনেননি। এটা কী জিনিস-তা জানতে চাইলে গোপাল সেই শালু কাপড় মোড়ানো বস্তু হতে আস্তে আস্তে সব কাপড় সরালো। শেষে দেখা গেল, মূলে একখানা খাটের ভাঙা পায়া। তাতেই কাপড় জড়ানো ছিল। “মহারাজ, আমার একখানা খাটের ভাঙা পায়ার সাথে কাপড় মুড়ে এই পূরাণ তৈরী। খাট+অঙ্গ=খট্টাঙ্গ পূরাণ। ” সারা দরবার হেসে কুটি কুটি।

আজকাল উপরের দুটো গপ্প খুব বেশি মনে পড়ে। দাগিয়ে দেখাতে না পারায় (মানে অমূক মডেল, তমূক কী ওয়ার্ডস আর ব্রান্ডিং নামের ঢোল বাজাতে না পারায়), অনেক জ্ঞানী ও উপযুক্ত প্রোফেশনাল নামকাম কামাতে পারছেন না। তারা থাকছেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। আর সেই সুযোগে অনেকেই দাগিয়ে বেড়াচ্ছেন। গুরু ও গরু-দুইই বনে যাচ্ছেন। আর অনেকে আবার ওই খট্টাঙ্গ পূরাণ হতে বিদ্যা হাসিল করে বেশ দুপয়সা ও দুআনা ব্রান্ডিং কামিয়ে নিচ্ছেন। কার ঘটে সত্যি সত্যি বিদ্যা কতটা আছে, সেটা আজকাল কেউ আর তলিয়ে দেখে না। ফেসবুকে কতটা দাপটের সাথে বিচরন-সেটাই আজকাল যোগ্যতার বড় পরিচায়ক।

print

কমেন্ট করুন