ইতিহাসের পাতায় অবহেলিত এক বীরের নাম মেজর গনি  

ইতিহাসের পাতায় অবহেলিত এক বীরের নাম মেজর গনি  

আমাদের ইতিহাসে অগ্নিঝরা নাম মেজর আবদুল গনি। জন্ম ১৯১৫ সালের ১ ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার নাগাইশ গ্রামে। ঐতিহ্যবাহী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠাতা মেজর গনি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্বও তিনি। স্কুলজীবনেই সাথীদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘সবুজ কোর্তা’ বাহিনী, যা কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে দুর্যোগ মোকাবেলায় সামাজিক আন্দোলনে অবদান রাখে। মেজর গনি স্নাতক শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাইওনিয়ার কোরে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। বিশ্বযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখায় ‘টাইগার গনি’ হিসেবে পরিচিত লাভ করেন । পাইওনিয়ার কোরের সদস্যদের নিয়ে রেজিমেন্ট গঠনে অগ্রসর হন। পাকিস্তানের আত্মপ্রকাশের পর সেনাপ্রধান নিয়োজিত হন জেনারেল স্যার মেসার্ভি। ইতঃপূর্বে গঠিত দু’টি কোম্পানি নিয়ে বাঙালিদের জন্য রেজিমেন্ট গঠনের পরিকল্পনা সেনাপ্রধানের কাছে ব্যক্ত করেন মেজর গনি। মেসার্ভি বাঙালি সৈন্যদের প্রথম ইউনিট গঠন করার অনুমোদন দেন। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে ভারত থেকে দু’টি কোম্পানি নিয়ে ঢাকায় এসে ঘাঁটি তৈরি করেন কুর্মিটোলায়। শুরু হলো ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যাত্রা। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র ও দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এই রেজিমেন্ট না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ত। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনাবাহিনীর বেশির ভাগ সদস্য এই রেজিমেন্টের সদস্য।

 

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে চা চক্রে জিওসি আইয়ুব খান বলেন, বাঙালি সৈনিকেরা উর্দু ভাষায় কথা বলবে। আইয়ুব খানের কথায় তীব্র প্রতিবাদ জানান মেজর গনি। বলেন, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা, বাঙালি সৈন্যরা কখনোই উর্দু ভাষায় কথা বলবে না।’ আইয়ুব খান ‘শাট আপ, সিট ডাউন’ বলে তাকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। পরে উর্দু ভাষায় কথা বলার আদেশ অমান্য করেন মেজর গনি। ভাষা আন্দোলনের একজন সূচনা সৈনিক এই মেজর গনি।১৯৫৩ সালে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে যুক্তফ্রন্ট ও মুসলিম লীগের প্রার্থীদের বিপুল ভোটে পরাজিত করে কুমিল্লা থেকে তিনি নির্বাচিত হন। ১১ নভেম্বর, ১৯৫৭ সাল। আইনসভার সদস্য হিসেবে অক্টোবর মাসে জার্মানির বার্লিনে বিশ্বের সাবেক সেনাদের সম্মেলনে যোগদানকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরবিদায় নেন এই বীর ।

 

বাঙ্গালীর ইতিহাসের এই কৃতি সন্তানের অবদানের স্বীকৃতি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সরকারিভাবে তার জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন, তাঁকে জাতীয় বীরের মর্যাদা প্রদান, জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ড তার নামে নামকরণ, স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকে তার জীবনী প্রকাশ, কুমিল্লা ময়নামতি সেনানিবাস তার নামে নামকরণ করে আমরা তাঁর অবদানকে মরণোত্তর সম্মান দেখাতে জোর দাবি জানাচ্ছি।এ সকল ব্যবস্থা করে ইতিহাসের এই সমৃদ্ধ অংশটুকু  নতুন প্রজন্মকে জানানো হোক ।

 

সরকার মিজান
সহকারি শিক্ষক (আইসিটি)
নাগাইশ মডার্ন হাই স্কুল
Headlines
error: আপনি আমাদের লেখা কপি করতে পারবেন নাহ। Email: [email protected]