আজও খুঁজে পাইলাম নাহ পুতি’র মালা- মীর সজিব।

48362789_1192034840949489_1402993338306527232_o
 
সহজ ভাষায় একটা কথা বলে, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ ই হলো জঙ্গল’কে মঙ্গল করা। ছাত্রজীবনে ভাবতাম, আহ!! ইঞ্জিনিয়ার হবো, সারাদিন অফিসের ডেক্স-এ বসে এসির বাতাস খাবো আর প্রচুর টাকা ইনকাম করবো। আহারে!!! জানা ছিলো না এই সেক্টর যে এসির বাতাস খাওয়ার বদলে প্রকৃতির সুন্দর সৃষ্টির বাতাস খাওয়া তাও আবার বালিযুক্ত বাতাস।
আসল কথায় আসি,
ছোটবেলায় গ্রামেই ছিলাম। এসএসসি লেভেল পর্যন্ত গ্রামেই। গ্রামের পরিবেশটা উপভোগ করতে পেরেছিলাম প্রাইমারী লেভেল থাকা পর্যন্ত, প্রাইমারী লেভেল পার করতেই গ্রামের মাঝেই কেমন যেন শহুরের বাতাস লাগতে শুরু করে।
ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, পাড়ায় পাড়ায় ইটের ইমারত দেখা যায়৷ গ্রামের পরিবেশটায় যেন কেমন বদল হয়ে যাচ্ছে। ছোট থাকতে দেখতাম৷ পাড়ার মানুষ সবাই একসাথে বসে নানা রকম আড্ডা দিতো, খেলাধুলা, সবাই মিলে খিচুরি খাওয়া, এক জনের বাড়িতে আরেকজন এর অবাধে আসা যাওয়া। ধীরে ধীরে মানুষগুলো কেমন যেন স্বার্থপর টাইপের হয়ে যেতে লাগলো। প্রাইমারি শেষ করতেই দেখি মানুষের মধ্যে আর আগের মতো মন-মানসিকতা নেই। সবাই নিজের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত। গ্রামে আধুনিকতার ছোয়া পেলো একদিকে, অপরদিকে হারিয়ে গেলো মানুষের মনুষ্যত্ব।
ছোটবেলাটা যেহেতু গ্রামেই কেটেছে, গ্রামের স্মৃতিগুলোও মনে আছে। সেই সময়ে গ্রামে গ্রামে মেলা হতো, ওরশ হতো, মাহফিল হতো, আবার মাঝে মাঝে যাত্রাপালা ও হতো রহিম-রুপবান নবার সিরাজ উদ্ দোলা বিভিন্ন নামের যাত্রা হতো।
এইসব অনুষ্ঠান গুলো ঘিরে বসতো বিভিন্ন দোকান পাঠ, চারপাশ আলোকবর্ষ দিয়ে ভরপুর থাকতো। পিঠার দোকান, ঝালমুড়ি, খেজুর কদমা, মিস্টির দোকান, সিঙারা পুরীর দোকান, নাগর-দোলা, স্বপ্নের নৌকা একবার উপরের দিকে আরেকবার নিচের দিকে, বাশির দোকান, হাড়ি পাতিলের দোকান, খেলনার হরেক রকম দোকান, তারপর বিশাল জায়গা নিয়ে বসতো মেয়েদের কসমেটিকস এর দোকান।
এই কসমেটিকস এর দোকান গুলোতে এত পরিমান মানুষ থাকতো যে তা হাতে গণনা করা অসম্ভব হয়ে যেত। মানুষের ধাক্কাধাক্কি, হৈচৈ, কেমন যেন একটা আনন্দের আওয়াজ ভেসে উঠতো।
ছোট থাকতে দেখতাম আমার চাচাতো বোনেরা তাদের টিফিনের টাকা জমিয়ে রাখতো মেলা/ওরশ থেকে এটা অইটা কিনবে বলে, যেহেতু ছোট ছিলাম তারা তাদের গার্ড হিসেবে আমাকে নিয়ে যেত, আমার বড় তিন ভাই কোন বোন নেই, আমার বাবা মা নাকি আমাকে দুনিয়ায় এনেছে মেয়ে হয়ে জন্মাবো বলে, হায়রে কপাল আমিও তাদের ছেলে সন্তান হলাম। তাই নাকি আমার চাচাতো বোনেরা আমাকে লিপস্টিক, কপালে টিপ দিয়ে সাজিয়ে রাখতো, আমাকে অনেক আদর করতো।

যাইহোক, আমাকে তারা তাদের গার্ড হিসেবে নিতো, আমিও যেতাম তাদের সাথে খেলনার বন্ধুক কিনবো বলে মেলা থেকে, বন্ধুকগুলো আবার কসমেটিকস এর দোকানগুলোতে পাওয়া যেত। তাদের সাথে গিয়ে দেখতাম তারা লিপস্টিক, টিপ, আলতা, নেইল পালিস হাবিজাবি কিনতো এতকিছুর নামও মনে নেই। তবে একটা জিনিস আমিও এখনো ভুলতে পারি নাহ, সেটা হলো পুতির মালা। এই পুতির মালাগুলো আমার কাছে বেশ লাগতো। মেয়েরা খালি গলায় এই পুতির মালাগুলো পড়লে কেমন যেন একটা নিষ্পাপ নিষ্পাপ লাগতো। তাদের অনেক পবিত্র মনে হতো, ডানা কাটা পরীগুলো মনে হয় তাদের মতোই হয়।
মাধ্যমিক পাশ করার পর গ্রামের মায়া ছেড়ে শহরে চলে আসতে বাধ্য হই, গ্রামের জন্য কয়েক ফোটা চোখের জল ও গড়িয়েছে, যদিও এ চাপা কষ্ট কাউকে বুঝানো যায় নাহ। যান্ত্রিক শহরে এসে নিজেকেও কেমন যেন যন্ত্র যন্ত্র টাইপ মনে হতে লাগলো, শহরের আধুনিকায়তন শরীরে বাসা বাধতে শুরু করে। এভাবেই চলতে শুরু শহুরের যান্ত্রিক নগরীতে। গ্রামেও খুব বেশি একটা যেতে পারি নাহ। তবে যেতে হয়, গ্রামের মাটি দিয়ে এ শরীর গঠন সেই গ্রামকে কি ভুলা যায়!
বেচে থাকার জন্য চাই অন্ন, এ অন্ন জোগাড় করতেই রাতদিন পড়াশোনা করে একাডেমিক কার্যক্রম একটা পর্যায়ে নিয়ে যাই। চাকুরীর সুবাদে যান্ত্রিক নগরীতে বসবাস হলেও প্রথমেই যে বললাম সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের কাজই যে জঙল কে মঙল করা।
ঢাকা থেকে খুব বেশি একটা দূরে নয়, তারপাশেই ধলেশ্বরী নদী, নদীর পাড় ঘেষেই তৈরি হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।
যেহেতু সিভিল সেক্টরে ছিলাম চলে আসলাম এই ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে, ধলেশ্বরী নদীর পশ্চিম দিকে গ্রাম, আর পূর্ব দিকে কল কারখানার শহর। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি আবার নদীর পশ্চিম পাশে, মানে গ্রামের দিকে।
নিরিবিলি পরিবেশ তেমন যান্ত্রিক নগরীর মতো নয়। প্রজেক্টের অবসর সময়টাতে গ্রাম ঘুরতে বের হয়ে যেতাম। মোটামুটি গ্রামের সবটায় ঘুরা হয়ে গিয়েছিলো।
একদিন আমাদের ইলেক্ট্রিসিয়ান এসে বলতেছে ভাইয়া যাবেন নাকি গ্রামের শেষের দিকে এখানে নাকি মেলা হচ্ছে। মেলার কথা শুনে বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা অনুভূতি তৈরি হলো।
সে বলতেছে সবাই নাকি যাবে মেলা দেখতে চলেন যাই। আমিও তাদের সাথে বেরিয়ে গেলাম মেলা দেখতে। সেখানে মেলাটা বসেছিলো যাত্রাপালা’কে ঘিরে, গ্রামের সবাই মিলে যাত্রাপালার আয়োজন করেছে।
সেই ছোট থাকতে গ্রামে যাত্রা দেখেছিলাম। আবার এত বছর পর এই গ্রামে এসে যাত্রাপালা দেখলাম তাও আবার যাত্রাকে ঘিরে বিশাল মেলার আয়োজন।
মেলায় ঠিক আগের মতোই সবকিছুই উঠেছে, মুড়ি-মুরকি, মিস্টি, সিঙারা, বুট-বাদাম, নাগরদোলা ইত্যাদি অনেক কিছু, ঠিক ছোটবেলায় দেখা মেলাগুলোর মতো এখানেও আলাদাভাবে বড় একটি জায়গা দখল করে কসমেটিকস এর দোকান। সেখানে অনেক মানুষের ভীড়।
আমিও সবার ভীড় ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। কসমেটিকস এর দোকান গুলো একটা একটা করে দেখতে লাগলাম। কেমন যেন সব আধুনিক জিনিস, মেয়েগুলো খুব দরদাম করে তাদের পছন্দনীয় জিনিস গুলো কিনে নিচ্ছে। আমিও তাদের কেনাকাটা গুলো দেখতে লাগলাম। মনে মনে হারিয়ে গেলাম সেই ছোট বেলায়, চাচাতো বোনদের গার্ড হিসেবে যাওয়া মেলার মূহুর্ত গুলো চোখে ভেসে আসতে শুরু করলো।
মেলার সবগুলো দোকান ঘুরলাম মনে মনে একটা জিনিসও খুজতেছিলাম, কোন দোকানেই পেলাম নাহ। আমার চোখেও পড়েনি। অনেক খোজাখুজি করেছি।
একটা পর্যায়ে এক দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম ‘আচ্ছা আপনাদের এখানে পুতির মালাগুলো বিক্রি করেন নাহ’।
দোকানি একটা ভুবন ভুলানো হাসি দিয়ে বলে নারে বাপজান এখন আর কেউ পুতির মালা কিনে নাহ।
আমার খুব ইচ্ছে ছিলো এসব মেলা থেকে পুতির মালা কিনবো, পুতির মালা আমি নিজের হাতে তাহার সাদা মসৃণ নগ্ন গলায় পড়িয়ে দিবো। আমি এক দৃষ্টিতে তাহার গলায় পরিহিত পুতির মালা দেখবো। ছোটবেলায় পরীদের রুপ আমি তাহার মাঝে খুজে পাবো সেই আসায় আমি মেলা থেকে পুতির মালা আনতে গিয়েছি, বিধি বাম সে আশা আমার পূরণ হইলো নাহ। তাহাকে ছোটবেলার পরীর রূপেও দেখিতে পারিলাম নাহ।
print

কমেন্ট করুন