পিরিয়ড নিয়ে কিসের ট্রল?

period-680x450

লেখা ঃ জাহাঙ্গীর আলম।

পিরিয়ড একটা ন্যাচারেল প্রসেস। একটা মেয়েকে মা’হতে হলে শুধু দশমাস গর্ভধারণ না, একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর থেকে প্রতিমাসে এই যন্ত্রণাকর প্রসেসটা ফেইস করে করে তবেই এগুতে হয়। বছরের পর বছর, ধারাবাহিক ভাবে। এটা না হলে, বা অনিয়মিত হলে অন্য সমস্যা। আচ্ছা সব সমস্যা বাদই দিলাম, একটা সমস্যা বলি – সে মা হবার ক্ষমতাও চিরতরে হারিয়ে ফেলতে পারে।

একটা শিশুকে পৃথিবীতে আনতে, মা হয়ে উঠতে একটা মেয়েকে কী পরিমাণ ত্যাগস্বীকার করতে হয়!
ভাবা যায়?
 
সব থেকে বড় কথা পিরিয়দের দিনগুলোতে সেইভে থাকাটাও খুব টাফ, অন্তত আমাদের মত দেশে, সামাজিক অবস্থান বিবেচনায়। এটা নিয়ে একটা মেয়েকে স্কুল-কলেজ যেতে হয়, অফিস করতে হয়, ঘরদোয়ার সামলাতে হয়, কত্ত কত্ত দৌড়ঝাঁপ!
এখনও তো আমাদের দেশে অনেকেই এটাকে অভিশাপ বা রোগ মনে করে! তার উপর ময়লা কাপড় ব্যবহারে ইনফেকশন কিংবা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছেই। দেশ আগাচ্ছে, আমরা শিক্ষিত হচ্ছি। আশার কথা হচ্ছে আমাদের দেশের মেয়েরাও পিরিয়ড নিয়ে সচেতন হচ্ছে, তারাও এখন লজ্জা নয়, বাস্তবতা বুঝে এই ট্যাবু ভাঙার জন্য, সবাইকে সচেতন করতে সাহসিকতা দেখিয়ে এগিয়ে আসছে। কোথায় আমরা পুরুষ তাদের উৎসাহ দিয়ে পাশে দাঁড়াবো, সহযোগীতা করবো, তা নয় উল্টো তাদের নিয়ে ট্রল করছি! নিছক কিছু সস্তা ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তার জন্য!
 
আপনি যত বড়ই হননা কেন, যতই ট্রল করেন না কেন, এই “জঘন্য” জিনিসটাই আপনার মা দিনের পর দিন বয়ে নিয়ে গিয়েছে বলেই আপনি এখন পৃথিবীতে। আর পৃথিবীতে এসে, বড় হয়ে আপনি এখন বড় একখানা বা* হয়ে উঠে মা বোনদের বিরুদ্ধে এটা নিয়েই ট্রল করছেন!
 
কন্ডম হাতে নিয়ে আবার কেউ কেউ ছবি পোস্ট দিয়ে মহান সৈনিক হয়ে যাচ্ছেন। তা করছেন ভালোকথা, তা আপনি যে এই প্যাড, পিরিয়ড এর বিরুদ্ধে ট্রল করে ফেনা তুলে ফেলছেন তা আপনার মা-বোন কি সেটা জানে? না মানে বলছিলাম কি, পরের মা বোনের দিকে আঙ্গুল তোলার আগে নিজের ঘরে তুলেছেন তো?
 
তাদেরও তো পিরিয়ড হয়, আপনার মায়ের পিরিয়ড ঠিক ছিলো বলেই তো আপনি জন্মেছেন। তারা তো এটা নিয়ে আরও ভালো জানে। আপনার আম্মুর সাথেও কি এটাই করছেন, একই ট্রল? বা বোনের সাথে?
আপনি ট্রল করে, প্যাড নিয়ে ট্যাবু ভাঙার বিরুদ্ধে আন্দোলন ডেকে কন্ডম হাতে ছবি দিয়ে বীর সৈনিক হয়ে যাবার আগে, সেটা আবার শেয়ার দিয়ে একেকজন “সওয়াব” কামানোর আগে আপনি শিওর তো, যে আপনি কোন কন্ডম দূর্ঘটনারই ফসল কিনা?
 
সহনীয় মাত্রায় সহনীয় জিনিষ থাকা ভাল। কন্ডম বা স্যানিটারি প্যাড কোনটাই খারাপ কিছু নয়। একটি মেয়ের পেট উচু মানে সে সেক্স করেছে এটা তার প্রমাণ। সবাই বুঝি, মেয়েটি প্রমাণ বয়ে বেরাচ্ছে আর ছেলেটি (আমরা)? কনডম খারাপ কিছু নয় যেমন প্যাড। জন্ম নিরোধক একটা জিনিষ মাত্র। আরেকটা জন্ম হওয়ার প্রক্রিয়া। আমার মাথাতে কোনভাবেই আসেনা, প্যাড বা কনডম নিয়ে মাতামাতি। প্যাডের মতো প্যাড চলুক কনডমের মত কনডম, ট্যাবু কি?
 
ট্যাবু আমি আপনি সবাই তৈরি করি, হোমমেড।
বাট যখন দেখি এটা নিয়ে ট্রল হয়, আবার প্যাড হাতে নিয়ে ছবিকে ট্রল করে একদল আবার কন্ডম হাতে নিয়ে ছবি দেয় তখন সহ্যশক্তিও প্রতিবাদ করে বলে ওঠে এই বা*গুলারে ডাস্টবিনের কুকুরের বিষ্ঠা খাওয়াইতে পারতাম!
 
আবারো বলছি, অতিরিক্ত বা বাড়াবাড়ি কিছুই ভালো না। এই যারা যারা প্যাডের বিরুদ্ধে ট্রল করছে, প্যাড হাতে নেয়া মেয়েদের ছবিগুলো নিয়ে ট্রল করছে, মেয়েদের প্যাড নিয়ে ট্যাবু ভাঙার উদ্যোগের বিরুদ্ধে গিয়ে কন্ডম হাতে নিয়ে ছবি তুলে পোস্ট দিচ্ছেন, যারা আবার সেগুলো শেয়ার দিয়ে একাত্মতা জানাচ্ছে এদের প্রত্যেকেরই জন্ম নিয়ে আমি বিভ্রান্তিহীন সন্দিহান।
 
এরা প্রত্যেকটাই একেকটা সামাজিক কীট। এমন কীট, যাদের জন্য আমাদের সমাজ এখনও মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনা। ওহ কীটতো কীট’ই, ওর নিজেরইতো মেরুদন্ড নেই, তাই সে চায়না অন্যরা মেরুদন্ড সোজা হয়ে দাঁড়াক। ঠিক যেন “লেজ কাটা শিয়াল” এর গল্প।
 
এদের কাছে নিজের মা-বোনও কতটা নিরাপদ কে জানে! এইসব কীটদের মায়েদের জন্য ভীষণ দুঃখ হয়, তারা যদি জানতো তাদের ছেলের এই “উন্নতি”র কথা, নিশ্চয়ই “গর্বে” এইটাই ভেবে মরে যেতে চাইতো কেন এই “সুন্দর” প্রদীপকে পৃথিবীতে এনেছে। এইসব কীটদের মায়েদের তাদের ছেলেদের এই “বীরত্বের” গল্পগুলো জানানো উচিৎ। তাই আমি চাই ঐ ট্রল করা মানুষ গুলো যদি কারো পরিচিত হয়ে থাকে, তাহলেলে দেরী নয় এক্ষুনি তাদের ট্রল গুলো তাদের মা বোনদের নিয়ে গিয়ে দেখান। ওরা দেখুক ওদের সাত রাজার ধন আদরের ভাই কতটা সম্মান দিচ্ছে নিজের মা বোনকে।
 
ইশ্, এইসব ছেলেদের মায়েরা, বোনেরা, বউ কিংবা প্রেমিকা যদি, একদিন, জাস্ট একদিন রক্তমাখা প্যাড এই বীর ছেলের মুখে বেঁধে দিতে পারতো তবেই সম্ভবত এই কীটজাতগুলোর একটু বোধোদয় হয় আর শুভ বুদ্ধির উদয় হয়।
 
এখন আমার, ওদের মায়েদের জন্য আফসোস হয়, ভীষণ আফসোস।
 

পিরিয়ড নিয়ে কিসের ট্রল আর কেন এটা ট্যাবু হবে! ||

print

Hits: 19

কমেন্ট করুন