মানুষ মুখোশে পিশাচী

17353253_1865449817061889_4652881398571337540_n
লেখা ঃ জাহাঙ্গীর আলম।
নেহার মৃত্যুটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না নবারুনবাবু । মেয়ে নিশাকে স্কুলে দিয়ে ফিরে আসার পথে, একদিন হঠাৎই হারিয়ে যায় নেহা। পাওয়া গেল যখন, নেকেড়ের আঘাতে জর্জরিত হওয়া কোন প্রানীর দেহর মতই ছিল নেহার শরীর। তখনও দেহে ধিকিধিকি করে চলছিল হৃদপিন্ড । তারপর হাসপাতালে টানা দু’ঘন্টা যমে মানুষে লড়াইয়ের পর, শেষে যমের হাতেই নিজেকে সঁপে দেয় নেহা । পোস্টমর্টেম রিপোর্টে লেখা ছিল, কোন ভোঁতা জিনিস দিয়ে অসংখ্য বার আঘাত করা হয়েছে শরীরের বিভিন্ন জায়গায়, তার আগে করা হয়েছে পাশবিক নির্যাত এবং ধর্ষণ। অধিক রক্ত ক্ষরণের ফলে মাল্টি অর্গান ফেলিওর । 
নিশার বয়স তখন দশ। নবারুনবাবু তখন রিফা থানার হেড কনস্টেবল। রুটিন তদন্ত একটা হয়েছিল বটে, তবে সেটা নবারুন বাবুর পক্ষে সুখকর ছিল না। তদন্তে উঠে আসে নেহা দেবীর চরিত্র নিয়ে নানান গোপন তথ্য। নেহাদেবীকে নাকি স্কুল ফেরার পথে, অনেকের সাথেই গল্প করতে দেখা যেতো। তাদের মধ্যেই একজন রাজ।
এরপর রাজকে গ্রেফতার করা হয় । বয়ানে সে স্বীকার করে নেয়, নেহাদেবীর সাথে তার পরিচয় ছিল। তবে সেটা কোন অবৈধ সম্পর্ক নয়। রাজ বাই প্রফেশন একজন টিচার । আর নেহাদেবীর মেয়ের প্রয়োজন ছিল একজন টিচারের সেই সূত্রেই পরিচয় , এমনকি সামনের সেশন থেকে পড়ানোর কথাও পাকা ছিল। কিন্তু মাঝপথে এরকম হয়ে যাবে, সে ভাবতেও পারেনি!
এরপর বিভিন্ন সোর্স কাজে লাগিয়ে তদানীন্তন পুলিশ অফিসার নুরু মিয়া, একের পর এক অনেককেই ফাটকে পুড়লেন। কিন্তু সাক্ষ্য প্রমানের অভাবে এবং সময় মতো চার্জশিট না দেওয়ার দরুণ একে একে সবাই ছাড়া পেয়ে গেল । তবুও তিনি চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখেননি, কিন্তু এতো বড় শহরে, কোন ক্লু ছাড়া অপরাধী খোঁজা অনেকটা খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার সামিল, তাই শেষ পর্যন্ত অপরাধী অধরাই থেকে গেছে ।
দেখতে দেখতে পাঁচটি বছর কেটে গেছে । নিশা এখন ক্লাস নাইনের ছাত্রী । বর্তমানে সে দিদা দাদুর কাছেই থাকে , একমাত্র মেয়েকে হারানোর পর, তার স্মৃতি আঁকড়েই বেঁচে থাকতে চান তারা নেহাদেবীর পরিবার।
নবারুন বাবু এখন বাহরাইনের রাজধানী মানামার এক দুঁদে অফিসার। নেহার মৃত্যুর পর একাকিত্ব গ্রাস করেছে তাকে। নেহা যে নবরুনের গিন্নী ছিল। মাস তিনেক আগে একটা রেড লাইট এড়িয়াতে রেড্ করতে গিয়ে, তার সাথে শালিনির পরিচয় হয় । ইথিওপিয়ান  মেয়ে, আসল নাম রুমি কিন্তু এখন নাম বদলে শালিনি।
বর্তমানে শালিনি নবারুনবাবুর জীবনে, বাঁচার রসদ। ব্যস্ত সময়ে কাজের ফাঁকে ফাঁকে ফোন করা ছাড়াও, অবসর সময়ের বেশির ভাগটাই জুড়েই আছে শালিনির অবাধ প্রবেশ।  সেদিন দুজন লেকের পাড়ে বসে শালিনির হাতের আঙুলের  আংটির দিকে চেয়ে, হঠাৎই নবারুনবাবু বলে উঠলেন-
আংটিটা বেশ দামী মনে হচ্ছে , তবে তোমার হাতে মানাচ্ছে না!
শালিনি হঠাৎই বলে উঠলো-
এই আংটির হাত ধরেই আমার পতনের সূত্রপাত। সূর্যকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গিয়েছিল । তিন মাসের প্রেম তারপর বিয়ের প্রতিশ্রুতি। আর এই যে আংটিটা দেখছেন এটা সূর্যই আমাকে মন্দিরে বিয়ের দিন পড়িয়ে দিয়েছিল।
নবারুনবাবু বলে উঠলেন-
 তারপর……?
তারপর, সেখান থেকে সোজা মানামায়। একটা হোটেলে উঠলাম। কতো স্বপ্ন, কতো আশা। রাত শেষে যখন ঘুমটা ভাঙলো…..
শালিনিকে থামিয়ে নবারুনবাবু বলে উঠলেন বুঝে গেছি, ফাঁদে পড়েছিলে।
শালিনি বলে চললো…… 
জীবনে অনেক অত্যাচার সহ্য করেছি । তবু এই আংটিকে ভুলিনি। এই আংটিই আমায়, প্রতি মুহুর্তে মনে করায় আমার ভুল, আমার পাপ।
নবারুনবাবু বললেন- 
তুমি পুলিশে জানাওনি কখনো?
তারপর শালিনি বললো-
একবার নোংরা হয়ে গেলে, নিজের বাড়িতেও যে একফালি জায়গার সংকুলান হয় না দারোগা বাবু। পুলিশে গিয়ে কোন লাভ নেই। আমার মতো মেয়ের সাথে অবসর কাটানো যায়, একসাথে থাকা যায় কিন্তু বিয়ে করা যায় না 
কি বলেন নব বাবু? চাপে পড়ে গেলেন তো!
 হা হা হা 
নবারুনবাবু হঠাৎই বলে উঠলেন
রাত হয়েছেএবার বাড়ি ফেরা যাক?
শালিনিকে গন্তব্যে নামানো মাত্রই, সে তার ব্যাগ থেকে একটা ছবি নবারুনবাবুর হাতে দিয়ে বলে উঠলো- স্যার, সূর্য। যদি পারেন,  উপযুক্ত শাস্তি দেবেন।
বিনিময়ে?  নবারুনবাবু কঠিন কন্ঠে বলে উঠলেন।
– আপনি যা চান তাই পাবেন।
যদি তোমার এই আংটিটা এখনই চাই, দেবে?
শালিনি মৃদু হেসে আংটিটা খুলতে খুলতে বলে উঠলো ডিল ফাইনাল ?
তারপর, নবারুনবাবু আংটিটা আঙুলে পড়ে বললেন, ডান।
পরদিন থানায় পৌঁছেই, জুনিয়র অফিসার রাধিকাকে নিজের কেবিনে ডেকে নিলেন নবারুনবাবু । সূর্যের ফটোটা হাতে দিয়ে বললেন-  দু দিনের মধ্যে পুরো ডিটেইলস চাই। 
দু দিন পর রিপোর্ট আসতেই চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন নবারুনবাবু । রিপোর্টের কপিতে চোখ বোলাতে বোলাতে, গম্ভীর হয়ে গেলেন তিনি। 
তারপর, পরপর তিন চারটে সিগারেট নিমেষে উড়িয়ে সোজা চললেন বাড়ির পথে।  মানুষ মুখোশে পিশাচী!
এইতো রাজ, আবার এই কিনা সূর্য! 
তিন দিন পর ,এক শনিবার সাত সকালেই কলিং বেলের আওয়াজে , ঘুম ভেঙে গেল নবারুনবাবুর।  দরজা খুলে বিস্ময়ের সাথে দেখলেন রাধিকাকে,
হোয়াট আ সারপ্রাইজ?
আচমকা রাধিকা বলে উঠলো-
সকাল সকাল একটা অ্যাকসিডেন্ট ঘটে গেছে স্যার । মধ্য মানমার একটা বাড়ি থেকে সূর্যর মৃত দেহ উদ্ধার হয়েছে । প্রাথমিক অনুমান, অবসাদ থেকে আত্মহত্যা । ফরেন্সিকের মতে ড্রাগের ওভার ডোজ। মৃতদেহের সামনে একটা সিরিঞ্জও পাওয়া গেছে। মৃতদেহ ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
কিন্তু……?
কিন্তু কি রাধিকা? গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন নবারুনবাবু। 
– চা খেতে খেতে বলি, রাধিকা অস্পষ্টে স্বরে বললো।
নবারুনবাবু হাসিমুখে বললেন কিচেনটা ডানদিকে।
কিছুক্ষণ পর চায়ের কাপ হাতে রাধিকার প্রবেশ করলো ঘরে । একটা কাপ নবারুনবাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে অপর কাপটিতে একটা স্বস্তির চুমুক দিয়ে রাধিকা বলে উঠলো-
ঘটনার সূত্রপাত পাঁচ বছর আগে । নিজের মেয়েকে স্কুলে দিয়ে ফেরার পথে স্কুলের সামনে একটি ছেলেকে রোজ দেখতে পেতেন এক ভদ্রমহিলা । সন্দেহ বসে জনৈক এক দোকানদারের মারফত জানতে পারেন ঐ ছেলেটি স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের নাকি নেশার জিনিস বিক্রি করতো । একদিন স্কুলের সামনে সেই ছেলেটিকে  সন্দেহ বশেই চ্যালেঞ্জ করে বসেন তিনি । পুলিশে জানানোর হুমকিও দেন । কিছুদিন পরে উদ্ধার হয় সেই ভদ্রমহিলার ক্ষত বিক্ষত শরীর । ভদ্রমহিলার স্বামী পুলিশে কাজ করতেন । ওনার বস সেই সময় সন্দেহভাজন একটি ছেলেকে গ্রেফতারও করে । কিন্তু প্রমানের অভাবে ছাড়া পেয়ে যায় সে । ভদ্রমহিলার স্বামীর বরাবরের অভিযোগ ছিল আমাদের সিস্টেমের বিরুদ্ধে। বারবার তার মুখে সিস্টেমের ব্যর্থতার ইতিহাস শুনেই আমরা বড় হয়েছি স্যার।
নবারুনবাবু চিৎকার করে বলে উঠলেন গ্রেট জব, রাধিকা। বাকি গল্পটা, তাহলে আমিই বলি-
শালিনির হাতে নেহাকে জন্মদিনে গিফট করা আংটিটা দেখে, আমি অবাক হয়ে যাই । তারপর শালিনির হাত ধরে সূর্য ।
রাধিকা তোমার রিপোর্টে পরিস্কার লেখা ছিল।
সূর্য ওরফে রাজ ওরফে মুকুল মন্ডলের বাড়ি দক্ষিণ রিফা। বেশ কয়েকটি বছর এদিক ঐদিক কাটানোর সুবাদে ইংলিশটা সে ভালোই বলতো । তারপর মানামায় ফিরে প্রফেশনে হিসেবে বেছে নেয় ইংলিশ টিচিং। 
তবে কানাঘুষা শোনা যায়, ড্রাগ পেডলার হিসেবে অন্ধকার জগতের সঙ্গে ভাল একটা সখ্যতা ছিল তার ।
 বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠতাও ছিল । পুলিশের খাতায় দু একটা ছোট অভিযোগ আছে বটে , তবে একটাও জোড়ালো নয় । মানামার বেশ কয়েকটি অভিজাত হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত ছিল । কিছু দিন ধরে নারী পাচার চক্রের এক পান্ডার সাথেও ঘুরতে দেখা গেছে তাকে । তবে এবারেও কোন অভিযোগ না থাকায়, পাখি  মুক্তই ছিল।
তোমার সেই রিপোর্টটা দেখে, আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। যদি আমি সূর্যকে গ্রেফতারও করি, ফলাফল তো সেই শূন্যই হবে । আবার সেই, ব্লাডি সিস্টেমের প্রহসন। কিন্তু নেহা?? 
তার কি প্রাপ্য নয় একটু সুবিচার, রাধিক?
চোখ মুখ লাল হয়ে ওঠে নবারুনবাবুর । গম্ভীর স্বরে বলতে থাকেন-
গতকাল রাতেই পৌঁছে যাই তোমার রিপোর্টে উল্লিখিত ঠিকানায় । রাত তখন প্রায় দুটো । একটা মাস্টার কি দিয়ে খুলে ফেললাম সূর্যর ঘরের দরজা । সে তখন নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন । সামনের টেবিলে রাখা ড্রাগের সিরিঞ্জ । কিন্তু আমার তো চাই প্রমাণ । ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজতে খুঁজতে, অবশেষে ড্রয়ারের এক কোণে পেয়ে গেলাম কাঙ্খিত ড্রাগের পাঁচটা  ইউনিট । 
কেন জানি না আমি প্রতিহিংসার খেলায় মেতে উঠলাম । ভুলে গেলাম আমিও আইনি সিস্টেমেরই একটা অঙ্গ । একটা গোটা ইউনিট ড্রাগ সিরিঞ্জে ভরে চালান করে দিলাম সূর্যর শরীরে । প্রবল একটা ঝটকা দিয়ে সে এলিয়ে পড়লো সোফায়। আমি ছিটকে পড়লাম দেয়ালের একপাশে । ওর ঐ ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখদুটো দেখে আমার গা গুলিয়ে উঠলো । ও কিছু একটা চাইছিল আমার কাছে । হয়তো বলতে চাইছিল আমাকে আরেকটু বাঁচতে দাও অথবা আমাকে একটু জল…..
আমি অপেক্ষা করছিলাম । চোখ স্থির রেখেছিলাম ঘড়ির কাঁটায় । একটা সময় পর সব থেমে গেল । আমি নাড়ি টিপে অনুভব করলাম সূর্যর স্তব্ধতা।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন নবারুণবাবু । চায়ের কাপটা হাতে ধরা অবস্থাতে কখন যে ঠান্ডা হয়ে গেছে সে খেয়ালটাও ছিল না তার ।
 হঠাৎই শান্ত গলায় রাধিকার দিকে চেয়ে বললেন-
তো জুনিয়র অফিসার মিস রাধিকা, আমিআমি ধরা পড়ে গেলাম না? না সাসপেক্ট তালিকায় রাখবে? প্রমাণ করতে পারবে?
হাসিমুখে রাধিকা উত্তর দিল-
সেদিন রিপোর্ট দিতে এসে আপনার আঙুলে লেডিস আংটিটা দেখে চমকে উঠেছিলাম! আজ যখন সেই আংটিটাই মৃতদেহের ঘরের এক কোনে পড়ে থাকতে দেখলাম….
চমকে উঠলেন নবারুনবাবু । হাতের আঙুলের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন তিনি। ভয়ে অস্ফুটে বলে উঠলেন “নো ক্রাইম ইজ পারফেক্ট”। 
হঠাৎই রাধিকা পকেট থেকে,  শালিনির আংটিটা নবারুনবাবুর হাতে দিয়ে বলে উঠলো, এরপর থেকে সামলে রাখবেন স্যার “হ্যাভ এ গুড ডে”। রধিকা প্রস্থান করলেন।
রাধিকা চলে যেতেই,
নেহার ছবিটার দিকে তাকিয়ে চোয়াল দৃঢ় হয়ে গেল নবারুনবাবুর । হাতে ধরে থাকা আংটিটা নেহার ছবির সামনে রেখে বলে উঠলেন “গিন্নী এবার একটু শান্তিতে ঘুমাও”।

কমেন্ট করুন