সুমধুর আজানের সুর – মীর হৃদয়।

সুমধুর আজানের সুর – মীর হৃদয়।

অন্যদিনের তুলনায় আজকে একটু কান্না জরিত কন্ঠে তারাবির নামাজ পড়াচ্ছেন ইমাম সাহেব। ওনার সুমধুর কন্ঠের প্রতিটা আয়াতই কান্না জরিত কাঁপা কাঁপা কন্ঠে তেলাওয়াত করে যাচ্ছেন। কেমন যেন একটু অসাভাবিক লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা আজ ঠিক নেই। দ্রুত গতিতে পড়ে আসা তিলাওয়াত আজ মনে হচ্ছে এগুচ্ছেই না। কিন্তু হয়েছেটা কী? সবার ভেতরেই সুপ্ত প্রশ্ন জেগে আছে। প্রতি দু’রাকাত শেষ হতেই না হতেই কারো কারো প্রশ্নে পাত্তা না দিয়ে আবার আল্লাহ্‌ আকবার বলে নামাজে দাঁড়িয়ে যান!

 

এভাবে নামাজ শেষ হতে আজ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লেগে যায়। পিছনের সারিতে থাকা দুই এক জন উত্তেজিত কন্ঠে বলাবলি করে “সমস্যাটা কী… আজকে কি সারারাত লাগাবো নাকি!” আরেকজন এ ও বলে ফেলে যে, ১২ রাকাত তো শেষ বাকি ৮ রাকাত মুয়াজ্জিন পড়াতে আসে না কেন? মুয়াজ্জিনকে তো দেখাই যায় না, হুজুরতো দেখি একাই পড়াইতেছে। মুয়াজ্জিন কি নাই নাকি, আবার ছুটি কাটাইতে গেছেগা নাকি। কি সব মুয়াজ্জিন যে রাখে এইসব। দুইদিন পরপর খবর পাওয়া যায় না। শুনছেন, আজকে নাকি এশার আজান দুই জনে দিছে? হ আমিও তাই শুনছি প্রথমে একজন দিছে, পরে আরেকজন দিছে। কি যে পাইছে এরা.. কমিটির সাথে কথা বলতে হবে।
ওনাদের কথাবার্তা শুনে পাশেথাকা এক বয়স্ক মুরুব্বী বিরক্তিকর কন্ঠে বলে উঠে.. “তোমরা জোয়ান মানুষ, লম্বা নামাজ পড়তে তোমাদের এতই যখন কষ্ট হয, এই নেও বাবা আমার চেয়ারে বইসা পড়ো…” এই কথা বলে নিজ চেয়ারটা তাদের দিকে ঠেলে দিয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ শুরু করে দেন বয়স্ক মুরুব্বি! এতে তারা কিছুটা অপমানিত হয়ে চুপ হয়ে যায়।

 

ইমাম সাহেবের নামাজ পড়ানো শেষ। মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে এবার কিছু কথা বলার জন্য মিম্বারে উঠে দাঁড়ালেন। চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন। আমাদের এই মসজিদের মুয়াজ্জিনের জন্য সকলেই দু’আ করবেন, উনি আর এই দুনিয়াতে নাই!
সবাই অবাক হয়ে যায়! মানে কী? আজকে একটু আগেও তো তার কন্ঠে আযান শুনা গিয়েছিলো!
হুম… আপনাদের নামাজে সমস্যা হবে তাই এতকিছু আগে বলিনি।
উনি ক’দিন ধরেই অসুস্থ, উনার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গিয়েছিল। তবুও নিয়মিত আযান দিয়ে গেছেন। মাগরিবের পর একটু বেশিই অসুস্থ হয়ে যায়। আমিও জানতাম না। উনি উনার ছেলেকে ধরে ধরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে যায় এশার আযান দিতে। আযানের এক পর্যায়ে আবার কাশ উঠে.. মাইক বন্ধ করে কাশতে থাকে অবিরত। ছেলে পকেটে থাকা ইনহেলার বের করে দেয়। তিনি সেটা টানতে থাকে আর প্রচণ্ড যন্ত্রনায় ফ্লোরে বসে পড়ে। ছেলেকে আযানটা শেষ করার জন্য হাত দিয়ে ইশারা দেয়। বাকি আযানটুকু ছেলের ধ্বনিতেই সমাপ্তি ঘটে। আর তার বাবা নিথর হয়ে পড়ে থাকে মেঝেতে।
হঠাৎ থেমে যাওয়া আযানে অন্য গলার আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে যাই আমি, তাকে কিছু লোকদিয়ে হাসপাতালে পাঠানো হয়। নামাজের ওয়াক্ত ঘনিয়ে আসায় আমি সাথে যেতে পারিনি। ফরজ নামাজ পড়ার পর কানে আসে, তাকে আর বাচানো যায়নি। এ অবস্থাতে একাই আজ উঠে গিয়ে আপনাদের নিয়ে তারাবীটা শেষ করলাম। ফজরের নামাজের পর জানাজা হবে, আশাকরি সবাই শরিক হবেন।

 

ফজরের ওয়াক্ত হতেই মসজিদ প্রাঙ্গণে এসে মুয়াজ্জিনের ছেলেটি দাঁড়িয়ে থাকে। কান্না কান্না কন্ঠ নিয়েই বলে, হুজুর আজকের আযান আমি দেই? ইমাম মাথা নেড়ে বলে ঠিকাছে বাবা যাও…
মসজিদের ভেতর এলাকার মুরুব্বীরা বসে আছে। কমিটির সকলে এবং সভাপতিও এসেছেন। হুজুরকে দেখে বললেন… ওয়াক্ত হয়ে আসলো, আজতো মুয়াজ্জিন নাই, আপনিই দিয়ে আসেন। ইমাম সাহেব বলেন… অপেক্ষা করেন, আল্লাহ্‌র ঘরের আজান কখনোই বন্ধ হয় না, আযান এক্ষুনি হবে। একথা বলতেই মাইক দিয়ে আযানের ধ্বনি বেড়িয়ে আসে। সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। এতটা সুরেলা মধুর কন্ঠে সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। আযান শেষে সভাপতি বলে উঠেন কে দিলো এই আযান??!
আমাদের মুয়াজ্জিনের ছেলে।
মাশা-আল্লাহ্‌! ডেকে আনো ওকে।

 

ছেলেটি সামনে আসতেই সভাপতির চোখ কপালে উঠে যায়! এত ছোট ছেলের মুখে এই আযান! বাবা বয়স কত তোমার?
ছেলের কান্না কান্না কন্ঠে আস্তে করে উত্তর আসলো বারো বছর। অথচ দেখতে আরো অনেক ছোট। অথচ ওর মুখে যে আজানের মাধুর্য তা যে কারোরই মন কেড়ে নিবে। আজ ওর বাবা মারা গেছেন আর সে আযান দিতে মসজিদে চলে এসেছে! সভাপতির চোখে দিয়ে পানি পড়তে লাগলো।
— কী নাম তোমার?
— মোঃ বিলাল হোসেন।
— মাশা-আল্লাহ্‌! তুমি আজ তোমার বাবার রাখা নামটা সবার সামনে মাথা উঁচু করে তুলে ধরলে। তোমার বাবা তোমার সঠিক নামটাই রেখেছেন।

 

এলাকাবাসীকে উদ্দেশ্য করে বলে দেয় আজ থেকে এই মসজিদের আযান এই ছেলেটির কন্ঠেই হবে! একজন বলে উঠে.. কিন্তু সে এত দায়িত্ব নিবে কিভাবে? মুয়াজ্জিনের তো আরও অনেক দায়িত্ব থাকে।
তিনি বলে দেন মসজিদে খাদেম রাখা হবে, সে বাকি সব কাজ গুলো করে দিবে। ছেলেটি শুধু আযান দিবে, আর সে তার পড়াশুনাও নিয়মিত চালিয়ে যাবে। আমাদের মসজিদ কমিটি থেকেই তার বেতন সহ.. এক্সট্রা পড়াশুনার খরচ বহন করে নিবো। কি বলেন আপনারা? সবাই এক কথায় রাজি হয়ে যায়।
সভাপতি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আজ এই ছেলেটা এতিম হয়ে গেছে। আমরা কি পাড়ি না ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াতে? আমরা কি পাড়ি না ওর দুঃসময়ে মসিহা হতে? এই এতিম বাচ্চা ও তার পরিবারের জিম্মাদার এখন আমারাই। ভাই আমরা কি পারবো না এই ছেলে ও তার মায়ের বিপদেআপদে পাশে এসে দাঁড়াতে?

 

কালরাতের সেই সমালোচনা করা লোকটা চোখ মুছতে মুছতে উঠে এগিয়ে আসে, ছেলেটির মাথায় হাতবুলিয়ে বলে “বাবা তোমার বাড়িতে যত চাল লাগে.. তুমি আমার আরদ থেকে নিয়ে যাইবা, আমি বাইচা থাকতে তোমাদের খাওয়া নিয়ে কোনো কিচ্ছু ভাবতে হবে না।”
ছেলেটা সবার আন্তরিকতা দেখে দুঃখের মাঝেও খুশিতে কেঁদে দেয়। ইমাম ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলেন.. তোমার বাপ চলে গেছে এতে মনে কষ্ট নিয়ো না, আজ থেকে আমরাই তোমার খেয়াল রাখবো ইনশাআল্লাহ। এইটা এখন আমাদের এলাকাবাসীর দায়িত্ব তোমার মত অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো।এভাবেই আল্লাহ্‌ তার প্রিয় বান্দাদের ব্যবস্থা করে দেন… কিছু না চাইতেই তা নিজ রহমত থেকে সব দিয়ে দেন।
Headlines
error: আপনি আমাদের লেখা কপি করতে পারবেন নাহ। Email: [email protected]