পথশিশুদের স্থায়ী পুনর্বাসন জরুরী।

কেউ বলে পথের ফুল, কেউ বলে টোকাই। সম্বোধনটা আলাদা হলেও, পরিচয় কিন্তু একটাই। ওরা পথশিশু। ওরা পথে পথে ঘোরে, পথেই ঘুমায়। ওদের জীবন কাটে অর্ধাহার-অনাহার, অনাদর অবহেলায়। যুগের পর যুগ এভাবেই তাদের জীবন অতিবাহিত করতে হয়। তাদের জীবনমানের কোনো পরিবর্তন হয় না। সামান্য সহযোগিতা নয়, তাদের স্থায়ী পুনর্বাসন নিয়েও আমাদের ভাবা উচিত।
সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সারাদেশে পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। রাজধানী ঢাকায়ই আছে প্রায় ৬ লাখ পথশিশু। এদের কেউ এসেছে বাড়ি থেকে পালিয়ে, কেউবা এসেছে ভেঙে যাওয়া পরিবার থেকে বের হয়ে। কেউ অভাবের তাড়নায়, আবার কেউবা নদীভাঙনের শিকার হয়ে। এদের প্রায় সবারই বয়স ৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। সোশ্যাল এন্ড ইকোনকিম এনহান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (সিপ) এর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পথশিশুদের প্রায় ৪৪ শতাংশ মাদকাসক্ত, ৪১ শতাংশ শিশুর ঘুমানোর কোনো বিছানা নেই, ৪০ শতাংশ শিশু গোসল করতে পারে না, ৩৫ শতাংশ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে, ৫৪ শতাংশ অসুস্থ হলে দেখার কেউ নেই এবং ৭৫ শতাংশ শিশু অসুস্থ হলে ডাক্তারের সঙ্গে কোনো ধরণের যোগাযোগ করতে পারে না।
আরো জানা যায়, পথশিশুদের মধ্যে প্রায় ৯ ভাগ যৌন হয়রানির শিকার, তবে প্রায় ৯২ শতাংশ শিশুই যৌন হয়রানির কথা শিকার করে নি বা গোপন করেছে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে মাত্র ১২ বছর বয়সী মেয়েটাকে উদ্ধারের পর চিকিৎসক জানান, মেয়েটি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্তা! অবশেষে এই শিশুটি জন্ম দেয় আরেকটি শিশুর। ধর্ষণের শিকার এই কিশোরী পথশিশুটিকে যদি সময়মতো উদ্ধার না করা যেতো তাহলে হয়তো মা হতে গিয়ে পথের ধারেই মরে পড়ে থাকতো সে।
এই বিশাল সংখ্যক পথশিশুদের খুব কমই সুযোগ পাচ্ছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিশু সংস্থার আওতায় আসতে। সারাদেশে সরকারের পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র আছে মাত্র দু’টি, যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। যারা সংস্থার বাইরে থাকে, কি হয় তাদের পরিণতি? তাদের কেউ কেউ মাদকাসক্ত হয়ে রাস্তায়ই মারা যায়, কেউ শিশুপাচার চক্রের মাধ্যমে পাচার হয়ে যায়। যারা পাচারের শিকার হয়, হয় তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা করে বিক্রি করে দেওয়া হয়, নাহয় নানা ধরণের নির্যাতন করে প্রতিবন্ধী বানিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করতে বাধ্য করা হয়। যারা মেয়ে, তারা যৌন হয়রানির শিকার হয়, কোনো কোনো গ্যাঙ তাদের যৌনকর্মী হতে বাধ্য করে। টিএসসির জিনিয়ার মতো হাজারও জিনিয়া আমাদের অজান্তেই চলে যায় দেশ-বিদেশের পতিতালয়ে।
অপরাধী চক্রগুলো পথশিশুদের মাদকসহ নানা অবৈধ ব্যবসায় কাজে লাগায়। না চাইলেও অপরাধ করতে বাধ্য হয় ওরা। আবার কেউ কেউ অপরাধীদের সাথে থাকতে থাকতে ছিনতাই, চুরি, পকেটমারিতে হাত পাকিয়ে ফেলে। শুধু অপরাধী চক্রই নয়, রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের নানা স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহার করে ওদের।
খোলা আকাশের নিচে ঘুমানোর পরও তাদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ শিশুকে মাসিক ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দিতে হয় নৈশপ্রহরী ও মাস্তানদের। পুলিশি নির্যাতন ও গ্রেফতারেরও শিকার হয় তারা।
ঢাকাসহ সারাদেশে পথশিশুদের নিয়ে অনেক সরকারি-বেসরকারি সংগঠন কাজ করে। কেউ খাবার দেয়, কেউ পোশাক দেয়, কেউ দেয় শিক্ষা। আবার কেউবা বিনোদনের ব্যবস্থাও করে। কিন্তু দিনশেষে তাদের ফিরে আসতে হয় সেই পথেই। তাদের পুরোপুরি পুনর্বাসনের জন্য খুব বেশি উদ্যোগ নেই। সরকারী-বেসরকারী কোনো উদ্যোগই স্থায়ী ও টেকসই নয়। সারাবছর অর্ধাহারে-অনাহারে কাটিয়ে একদিন বিরিয়ানির প্যাকেট পাওয়া বা ছেঁড়া কাপড়ে বছর কাটিয়ে একদিন একটা পোশাক পাওয়া অনেকটা গুলির ঘায়ে মলম লাগানোর মতো। আসলে তাদের দরকার স্থায়ী পুনর্বাসন। তাদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। থাকার স্থায়ী জায়গা, খাবারের ব্যবস্থা ও শিক্ষার সু্যোগ করে দিতে হবে।
বিশিষ্টজনেরাও এ বিষয়ে একমত যে তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনে নজর দিতে হবে এবং তাদের উন্নয়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সভাপতি ইমরানুল হক চৌধুরী বলেন, ‘পথশিশুদের সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি এডুকেশন, বই এবং শিক্ষা সামগ্রী দেওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট মাসিক ভাতা প্রদান করতে হবে। এতে তারা শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হবে।”
বাংলাদেশ পথশিশু উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা মুহিব্বুল্লাহ আল মিরাজ বলেন,”পথশিশুদের আশ্রয়, খাদ্য ও কারিগরী প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে ওদের মধ্যে কিশোর অপরাধের প্রবণতা হ্রাস পাবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত পথশিশু সংগঠন আলোক আলয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা খান মুহম্মদ আব্দুল কাদের বলেন, ” দেশের সাধারণ নাগরিকদের মতো পথশিশুদেরও তথ্য সংগ্রহ করে জাতীয়ভাবে তালিকাভুক্তকরণ করতে হবে। তালিকাভুক্ত সকল শিশুকে থাকার জন্য শেল্টার ও খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের কারিগরী প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্জনের সুযোগ করে দিতে হবে। তাহলেই আপাতদৃষ্টিতে বোঝা মনে হওয়া এই লাখ লাখ পথশিশু পরিণত হবে দেশের জনসম্পদে।”
পথশিশুদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে স্থায়ী পুনর্বাসনের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের সকল পথশিশু ভিত্তিক সংস্থা ও সরকারের মিলিত উদ্যোগে বাংলাদেশের পথশিশু সমস্যার মোকাবেলা করা সম্ভব।
হাবিবুন নাহার মিমি
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।