একটা ঝুরঝুরে আঙুল- অনিন্দ্যকেতন গোস্বামী ।

আঙুলেই গেঁথে আছে সেইসব দিন। ঝুরঝুরে আঙুল এখন লাঠি হয়ে গেছে। পা এখন গাছ। প্রকৃত স্বাদুফল এখন আর নেই। তবু একবুক মাঠ প্রশস্ত হয়ে আছে বিল-কান্দায়। বিঘে বিঘে খন্দের কথা কন্ঠ বেয়ে গরুর গাড়ি চড়ে আসে। চোখের মণি বেয়ে উঠে আসে মাছ খেপলার ঘের বেয়ে। চৌধুরী মিঞা আর আসে না জ্যাঠাদের বাঁশতলায় তফিল আর নলি-সুতো হাতে। চকচকে নাইলনের সুতো দেখিয়ে বলত এগুলো জাপানী-কট। আমরা জাল বোনার পাশেই খেলতাম একবিদ্যা চীনা কাঁচের গুলি। চৌধুরী চেয়ে থাকত জাল বোনা ফেলে। তার চোখ হয়ে গুলি, আর আমাদের ছিটানো গুলি হয়ে যেত জাল…
বিকেলের আকাশ হয়ে যেত নবার কামারশালা। লাল লোহা দেগে পিটিয়ে চ্যাপ্টা করে দিত মেঘের মিনার।
গরু নিয়ে ফিরে যেত সুরজের ভাই। বজ্রের মতন পাচন ছুঁয়ে যেত লেজ।
এখন স্মৃতিরা শুধু মনের মধ্যে ট্রাংক গড়ে তোলে। দস্তাবেজ বেঁধে রাখি পিঠমোড়া।
তবুও হাটখোলা ঝুরি নামায়। প্রোথিত করে মহাকাল…সেখানে মদের মহড়া দিতে উঠে পড়ে জটা। হাতের তালুতে চুমু দিয়ে অদ্ভুত বাঁশি বাজায়। ডান হাতে হেঁসো ঘুরিয়ে উঠে যায় তালগাছে তাড়ির বাজারে। চিল্লিয়ে যেন হাট মেলে দিত ডগায় ডগায়। অশ্লীল ভাষা দিয়ে ঘোষণা করে যেত –বিকেলে বিক্রি হবে তাড়ি, ভবের বাজারে। চৌধুরী নুরানিতে হাত রেখে বলত-তওবা তওবা!
তবুও কি পথে পড়ত না ধুলো ? তবুও কি এঁদো সরণী বেয়ে নেমে আসতো না তেলচোঁয়া ফুলকো চাঁদ সন্ধানী গ্রাম্য বালকের মত ? তবুও কি শুক্লপক্ষে পনেরোদিন উজ্জ্বল কাস্তে ঝুলে থাকতো না আকাশের ফসলী মাঁচায় ?
মদনা থেকে গরীব সনাতন মন্ডল কাপড়ের সাদা আকশির ঝোলায় পেড়ে নিত নালশের ডিম। কোলকাতার ঝিলে অফুরন্ত বাবুরা মাছ ধরবেন মদ মাখিয়ে।
সব স্মৃতিই কি ভাঁপা বাক্স হয়ে যায় ? বাক্স-পেটরা ?
কোনও একদিন মধ্য-জ্যোৎস্না তরল হয়ে এলে চৌধুরী মিঞা ঘোলা কাঁচের চসমা পরে চুপিচুপি মাকে এসে বলত—ভাবিসাব চা করেন। কাল আপনার পুকুরে খেপলা ফেলবো…
আমরা বারান্দায় ঝুঁকেঝুঁকে পড়তাম পিদ্দুমের আলো… পড়তাম গঙ্গাফড়িংয়ের ঠ্যাং ছিঁড়ে কতবার চাপ দিয়ে ওঠানো নামানো করা যায়… পড়তাম কয় ফাঁসের খেপলা জাল শুরু করে শেষে কয় ‘মালি’ নামাতে হবে নীচে ? পড়তে পড়তে একদিন পৃষ্ঠা থেকে সব কালো অক্ষর উবে গেল। হাতে রইলো সাদা বই।
এইসব কথা আঙুলে লেখা আছে…
আঙুল এখন ঝুরঝুরে…
আঙুল এখন লাঠি…