‘বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ গল্প’—এক দেশ কালের সমীক্ষা

‘বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ গল্প’—এক দেশ কালের সমীক্ষা
সমালোচক—অনিন্দ্যকেতন গোস্বামী
সমালোচনা গ্রন্থ—বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ গল্প
সম্পাদনা—সাদ কামলী
প্রকাশক—অভিযান পাবলিশার্স
দাম—৮০০ টাকা(ভারতীয় মুদ্রা)
প্রচ্ছদ—পার্থপ্রতিম দাস
রবীন্দ্রনাথ তার ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় ছোটগল্পের যে বাঁধাধরা গন্ডী বেঁধে দিয়েছিলেন, সেই পটভূমিতেই বাংলাদেশের ছোটগল্প রচনার ধারা বেগবান হয় চল্লিশের দশকে।
সম্পাদক সাদ কামলী সে ভাবেই গল্পগুলিকে ধরবার চেষ্টা করেছেন তার “বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ গল্প” সংকলনে। সংকলনের প্রচ্ছদপটের ব্লার্বে সাল উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে ১৯৪৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত এই যে দীর্ঘ ৬০ বছরের বিপুল সাহিত্য সম্ভারের মধ্যে ছোটগল্পের অবস্থান “দেশভাগ, ভাষার লড়াই, স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বাধীনতা উত্তর রাজনৈতিক পরিবেশ” সবকিছুই প্রায় টেলিস্কোপের মত ধরা পড়েছে এই সুবৃহৎ ৭৩৫ পাতার গ্রন্থে।
এই বিপুল কর্মকান্ড ও দূরুহ কাজটিকে যখন সম্পাদক ও প্রকাশক অভিযান পাবলিশার্স দুই মলাটের মধ্যে সুনিপুন ভাবে নিয়ে আসেন তখন তাদেরকে সাবাসি দিতে হয় বৈকি।
আর এতবড় গ্রন্থের সমালোচনা করাটাও বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনের মত। যা কেউ বিশেষ ভাবে করতে সাহস পাবে না। বিশেষ করে মনে রাখতে হবে এটি কোনো একক গল্প বা উপন্যাস নয়। সামান্য কয়েকটি চরিত্র বা একমুখীন কাহিনীও নয় যাকে ময়না-টেবিলে ফেলে কাটা ছেঁড়া করা যাবে। এটি একটি সুবৃহৎ বহু গল্পের সমন্বয় সংকলন।
এ গল্পগ্রন্থের কাহিনীতে তাই বিপুল চরিত্রের সমাবেশ। তাদের হাজার কিসিমের ভাষা বৈচিত্র। বিপুল আঞ্চলিক উপাদান। নোয়াখালি, ফরিদপুর, যশোর, চাটগাঁ, রংপুর, সিলেট, খুলনা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বিক্রমপুর, বরিশাল থেকে আরম্ভ করে সমুদ্র উপকূল এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বা মেঘালয়ের বিস্তৃত মান্দিজাতির বাসভূমির কথা। যারা দলে দলে খ্রীষ্টান হয়ে যায়। সামান্য কিছু বেঁচেবর্তে থাকে ‘সাংসারেক’ ধর্ম অবলম্বন করে, উঠে আসে তাদের কথাও…
ছোট্ট বাংলাদেশটির হাজারো কথা নলকূপের মতন খনন করে নিয়ে আসা হয় এই গল্পগ্রন্থে।
এপার বাংলার সাহিত্যপ্রেমী ও সাহিত্যিকদের মধ্যে বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে এক প্রকারের কূপমণ্ডুকতা কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্যে যতখানি আমেরিকান, ইংল্যান্ড বা ইউরোপিয়ান ভাবধারা বা তাদের আত্মদর্শন উঠে আসে, ততখানি লক্ষ্য করা যায় না আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে। তারা বাংলাদেশ বেড়াতে যান। হৈ হৈ করে তাদের বইমেলা ঘেঁটে আসেন। কিন্তু সে দেশের বই নিয়ে দু’চার কথা বলতে বললেই নাক কুঁচকে ওঠেন। অথচ দুই বাংলায় আপামর বাঙালীরাই বসবাস করেন, এটা ভুলে যান। এই উন্নাসিকতা আত্মধ্বংসের সামিল। সেখানে এই সুবৃহৎ গল্পগ্রন্থটি অভিযান প্রকাশ করে একটু হলেও সেই শাপমোচন ঘটিয়েছে।

বাংলাদেশের পটভূমিতে দেশ বিভাগের আগেও ছোটগল্পের পরিসর ছিলো। সে সমস্ত গল্পের উপজীব্য ভাষা ছিলো দেশ বিভাগ পূর্ববর্তী নোয়াখালী বা বরিশাল অথবা খুলনার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কিংবা তেতাল্লিশের মন্বন্তর। গল্পকার আবুল মনসুর আহমেদ, আবু রুশদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এই তিন জনের নাম সেই সময়ের জন্যে নেওয়া যেতে পারে।

‘বাংলাদেশের শ্রষ্ঠ গল্প’ শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮) দিয়ে শুরু
এবং এযুগের বিশিষ্ট গল্পকার তৈহিন হাসান (১৯৭৭) দিয়ে শেষ।
দীর্ঘ এই সংকলনে বাংলাদেশের পয়ষট্টি জন শ্রেষ্ঠ গল্পকারকে স্থান দেওয়া হয়েছে। চমৎকার ভাবে শেষের দিকে স্থান দেওয়া হয়েছে তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি।
যদিও ‘শ্রেষ্ঠ’ শব্দবন্ধনীকে আমার ফ্যাকাশে মনে হয়। কারণ দীর্ঘ ষাটটি বছরে মাত্র পয়ষট্টিটি শ্রেষ্ঠ গল্প হতে পারে না। এ সম্পর্কে প্রকাশক ও সম্পাদক উভয়কেই সংশয়বাদী হয়ে উঠতে হয় ভূমিকাতেই।
তবুও সাদ কামলী নিজে একজন সফল গল্পকার এবং বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক। সুতরাং গল্প ও গল্পকার নির্বাচনে তার দৃঢ় প্রত্যয় আশা করতেই পারি।
গ্রন্থের প্রথমেই সওকত ওসমানের ‘থুতু’ গল্পে অবিভক্ত বাংলার ছোটনাগপুরের গোয়ালপল্লীর হিন্দু মুসলমান খ্রীষ্টান মানুষদের অকপট জীবনচিত্র ফুটে ওঠে। সেখানকার শূকর হত্যা, মনসুর, পাঞ্জাবী মুসলমান, ফাদার জোহানেস, তাদের বাংলা মিশ্রিত হিন্দি ভাষা অকপট ভাবে ধরা দেয় এ গল্পে।
অদ্ভুত ভাবে দেশভাগ কালীন সময়ের দলিল হিসেবে ভৌগলিক সীমাকে ধরে রাখে দ্বিতীয় গল্প সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনী’। দেশভাগের ফলে ফেলে যাওয়া একটি বাড়ি এবং সেখানকার দখলদারদের আত্মবীক্ষা হয়ে ওঠে এই গল্প
‘কান্নাদাসী’ গল্পে আবুবকর সিদ্দিক মৃত মুকুন্দর মা এবং ‘কুলখোয়ারী’ লক্ষীর জীবনকে বিন্যস্ত করেন অমায়িক।
সৈয়দ শামসুল হক তাঁর ‘সম্রাট’ গল্পে পঙ্গু জহির সাহেবের ভগ্ন-জীবনের কথাকে অপূর্ব ভঙ্গিমায় বয়ন করেন। জহির সাহেবের পুত্র সায়েদ, স্ত্রী মরিয়ম, মেয়ে রিজিয়া, ছোটছেলে সরীফ সবাইকে নিয়েই আবর্তিত হয় এ গল্প। যেখানে পঙ্গুত্বকে জহির সাহেব মনের ভুলেও মেনে নিতে পারেন না ‘সম্রাট জীবনে’।
শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’এর মত মূক পশুকে কেন্দ্রকরে কথা গড়ে তোলেন গল্পকার জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত তার ‘রংরাজ ফেরে না’ গল্পে। হিন্দু সমাজের অস্পৃশ্যতা টুকরো ভাবে উঠে আসে এ গল্পে, যা জাতিগত চিন্তায় ভারতীয় উপমহাদেশেরই একটা ধারণা দেয়।
বিপ্রদাস বড়ুয়ার গল্প ‘মৃত্যুই ধ্রুব জীবনের পরপারে’ গল্পটি পড়তে পড়তে ফরাসী গল্পকার গ্যী দ্য মোপাসাঁ’র কথা মনে পড়ে। মেদহীন অথচ ধর্ষণের কি নিপুন একটি আত্মদীক্ষাময় বর্ণনা। অভিযোগহীন একটি মেয়ের তিনজন ধর্ষণকারী কি বিপুল উদ্যোমে জীবনকে নিঃশেষ করে ফেলে। আসে অলৌকিকতা। এটি একটি সাহসী রচনা ৭০এর দশকের।
৭১এর যুদ্ধের নৃশংসতা প্রথম এ বইয়ে লক্ষ্য করা যায় গল্প ‘শোধ’এ। গল্পকার হরিশংকর জলদাস নোয়াখাইল্লা জেলেদের পরাস্ত জীবনের কাহিনী অপূর্ব কৌশলে বর্ণনা করেন। আধপাগলা ‘দইজ্যা বুইজ্যা’র প্রতিশোধ যেন হয়ে ওঠে ‘জলদাস’ জেলে জাতীর বেঁচে থাকার আকুল সংগ্রাম।
বিখ্যাত গল্পকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার গল্প ‘কান্না’ শুরু করেছেন এক মুর্দার জিয়ারতের দোয়ার মধ্য দিয়ে। আফাজ আলী ক্লান্ত অবসন্ন ভাবে কান্নাশ্রু মিশিয়ে দিনের পর দিন নানা কবরের সামনে জিয়ারত করে থাকেন। এপার বাংলার মানুষের কাছে যে গল্প এবং ভাষা দুই’ই নতুন।
বুলবুল চৌধুরীর ‘থু’ গল্পে ঢাকা শহরের নিম্ন কদর্য রূপটি ফুটে ওঠে।
সেলিনা হোসেনের ‘মীর আজিমের দুর্দিন’ অথবা সেলিম মোরশেদের ‘কাটা সাপের মুণ্ডু’, আকমল হোসেন নিপুর ‘কবজ পুরাণ’ অন্যএক জীবন জারকের গল্প হয়ে ওঠে।
সাহসী ব্যতিক্রমী ভাষা ও কাহিনী উঠে আসে গল্পকার সালমা বণীর ‘নীল উপাখ্যান’ গল্পে। বাস্তবতা আমাদের তাক লাগিয়ে দেয় ” মাটিতে গড়িয়ে পড়া ছটফটানো দেহের দিকে তাকিয়ে ফতেমা তখন গলা ফাটিয়ে বলে, বইলেছিলাম না জ্যোৎস্না ছিল একখান বুকা মাগি…” এমনতর আধুনিক ভাষায় গল্প বয়ানে।
বাংলাদেশের পটভূমিতেও হিন্দু সমাজের জাতপাত বিষয়টি উঠে আসে মুজতবা আহমেদ মুরশেদের ‘নীলমর্গের কোরাস’ গল্পে ভগবত ডোমের চরিত্রে।
গল্পের রীতি প্রকরণ বলা বা বয়ন পদ্ধতি ক্রমে অন্যমাত্রা নিয়েছে শেষের দিকের গল্পগুলোতে। হামীম কামরুল হকের ‘শূন্য পরাণ’ অথবা মাসুদা ভাট্টির ‘গভীর ঘুমের কবিতা’ সাবলীল আধুনিক ভাষার রূপ পায়।
আরো অনেক চমৎকার গল্প থেকে যায় যা সল্প পরিসরে বলে ওঠা হয় না। পাঠক তার নিশ্চিৎ খোঁজ করবেন আশাকরি।
তবুও মনের ভেতরে আরো ঈপ্সিত বাসনা থেকে যায়…
ভাষা আন্দোলনের গল্প,
ইতিহাসগত ভাবে ৭১ এর যুদ্ধ পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী অভিঘাতধর্মী গল্প,
ব্যপক পরিমান হিন্দু উদ্বাস্তুদের কথা কোথায় যেন হারিয়ে যায় এই সব গল্পগুলো থেকে।
১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন- বা
১৯৬৯ এর গনআন্দোলন- বা
১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন- বা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট আশা করেছিলাম গল্পের ভেতর দিয়ে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে। সে আশা খানিকটা প্রতিহত হয়েছে বলা চলে।
অনেক গল্পেই এদেশের বাঙালিদের কাছে বাংলাদেশী ক্রিয়াপদের ব্যবহার এবং আঞ্চলিক ভাষা আড়ষ্টতা হয়ে দেখা দেয়। তবু গল্পের প্রয়োজনে তা সবলীল হয়ে ওঠে।
আরো যে কথা না বললেই নয়, পার্থপ্রতীম দাসের অপূর্ব শীতল পাটি বয়নধর্মী প্রচ্ছদের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের ব্যঞ্জনাময় সাহিত্যের অনুপুঙ্খ দর্পণ হয়ে ওঠে এপার বাংলার সাহিত্যপ্রেমী মানুষদের কাছে।
আর এখানেই এই বৃহৎ গ্রন্থের সার্থকতা।