আমার ‘লাইলাতুল বরাত বা ক্বদর’ – ফাহমিদা আলী

images-1

 

“লাইলাতুল বরাত” কিংবা “লাইলাতুল ক্বদর” –

ছোটবেলায় আম্মার কাছ থেকে শিখেছিলাম, কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে এবং সে সেটা মনে রাখলে ইবাদত বন্দেগী কবুল হয় না ।

2005 সাল পর্যন্ত বাড়িতেই পালন করেছি এই বিশেষ রাত্রিগুলো । আম্মার সাথে সারাদিন রোজা রাখা, হালুয়া রুটি তৈরি করে গরীব দুঃখীদের মধ্যে বিলানো, আত্মীয় স্বজনদের পৌঁছে দেওয়া আর সন্ধ্যার পরে সওয়াবের আশায় গোসল করে নামাজ পড়তে যাওয়া – । আব্বা শিখিয়েছিলেন, এই রাত্রিগুলোর পবিত্রতায় গোসল করে নামাজ শুরু করতে হয় । তাতে সওয়াবের পরিমাণটা বাড়ে। সেই অনুযায়ী আমরা ইফতার করে, মাগরিবের নামাজ পড়েই এক এক জন করে গোসল করে নিতাম । তার আগেই আম্মা -আব্বার কাছে আমার নিজস্ব ভঙ্গিতে মাফ চাওয়া, “মাফ টাফ করে দিয়ো, নইলে কিন্তু কিছুই কবুল হবে না আমার”। দুজনেই হাসতেন শুনে। বলতেন, এভাবে বললে তো মাফ করব না। পা ধরে মাফ চাইতে হবে । আমি আরও বেশি অধিকারবোধের প্রয়োগ ঘটাতাম তখন, করলে করো, না করলে নেই । আমার কি? তোমাদের কারণে আমার কিছু কবুল হবে না । আমি ঠিক এভাবেই বলি। আমার যারা আপনজন, যারা আমাকে জানেন, তাদের সবার কাছে আমার এই আচরণগুলো পরিচিত । বাকিদের কাছে নয় । তাই বাকিদের কাছে ভুল বোঝার অবকাশটাই বেশি ।

জানা জিনিসও বারবার জিজ্ঞেস করে নিতাম নিশ্চিত হওয়ার জন্য । এসব ব্যাপারে আম্মা সব সময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। কারণ, তিনিই ছিলেন আমাদের বাংলা, ইংরেজি, গণিত কিংবা আরবি শেখানোর প্রথম এবং সর্ব শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ।

ভাইয়েরা মসজিদে চলে যেতো আর মাঝ রাতে বাড়িতে ফিরে এসে ঘরে বসেই বাকি সময়টা নিজের মত করে করত। আমরা বোনেরা একটা ঘরে বসে পড়তাম, আম্মা কখনও একই ঘরে থাকতেন আমাদের সাথে, কখনও বা অন্য ঘরে ।

নামাজ পড়ার ফাঁকে ফাঁকে হালুয়া রুটি খাওয়া, ঘুম কাটানোর জন্য একটু গল্প করে আবার শুরু করা এবং এরপর সেহরী খেয়ে ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমাতে যাওয়া।

আমার হারিয়ে ফেলা দিন – !

হ্যা, নিজের সংসার হওয়ার পরেও একইভাবে অনেক দূর থেকেও তাদের কাছে মুঠোফোনে একই ভঙ্গিতে মাফ চেয়েছি, প্রশ্ন করেছি যা জানার ছিল সেই বিষয়ে । এরপর একটা স্বস্তিবোধ নিয়ে শুরু করেছি।

এখনও রোজা রাখি, ইফতার করি । গোসল করে নামাজ শুরু করি । শুধু এখন আর আমার নিজস্ব ভঙ্গিতে মাফ চাওয়া হয় না, আর না কোন প্রশ্ন করতে পারি, জানার লক্ষ্যে। কিছু জানার থাকলে বইপত্র ঘাঁটি। মনের মধ্যে না পাওয়ারা দোদুল্যমান অবস্থায় ঝুলতে থাকে সারাক্ষণ, হতাশায় চাপ বাড়ে আরও ।

আমি আমার ভাইবোনের সাথেও ঠিক এমন আচরণই করি। সবাই আমার বড় বলেই হয়তো সয়ে যায় সব । তবু, অধিকারবোধের যথেচ্ছ অপব্যবহার করি আমি । কখনও কারো কাছে মাফ চাওয়া হয় না আমার । জানি, ওরা এমনিতেই করে দেবে ‘তা ।

এমন সব দিনে আমি সমভাবে আমার মা, বাবা দুজনকেই খুঁজি। একবার মাফ চেয়ে নেবার জন্য । তারা কি আমার ডাক শুনতে পায়? আমার ক্লান্ত স্বরের আহাজারি পৌঁছায় ওপারে, তাদের কাছে?

আজ আমার পালা এবার । তাদের জন্য প্রার্থনায় বসা, তাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে মাফ চাওয়ার ।

সবাই সবার মা বাবার জন্য তাদের দু’হাত উপরে তুলে ধরুক । সবার মুখে উচ্চারিত হোক, “রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বাইয়ানী সাগিরা “।

কমেন্ট করুন