প্রবাসীর ঈদ- মহিউদ্দিন পিয়াল।

প্রবাসীর ঈদ- মহিউদ্দিন পিয়াল।

ঈদ মানেই সুখ, ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই অনাবিল ভালবাসা। কিন্তু প্রবাসীদের জন্য ঈদ মানে বেদনা, ঈদ মানে যন্ত্রণা, ঈদ মানে প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার আকুতি।
ঈদ মানে মনে শত কষ্ট নিয়েও বলা, “হ্যাঁ, আমি ভাল আছি।” ঈদের আনন্দ সত্যিই অন্যরকম।পরিবারের সবার সাথে ঈদ করার মজাই আলাদা।কিন্তু সেই সুযোগ বা সুবিধা বঞ্চিত প্রবাসীরা।

 

দেশের ঈদ আনন্দ আর প্রবাসের ঈদ অনেকটাই ভিন্ন ধরনের। দেশের ঈদ হচ্ছে আনন্দ ভাগাভাগির, আর প্রবাসের ঈদ হচ্ছে একদিন ছুটি আর ছুটি মিলে দুই থেকে তিন দিন,দিনগুলা কেটে এর্লাম বিহীন ঘুমে।
দেশের ঈদ আনন্দ প্রবাসীরা কি রকম মিস করে তা দেশের মানুষ কোন সময়েই অনুভব করতে পারবেনা বা বুঝতেও পারবে না। ঈদের দিনে খুবই মনে পড়ে সেই সব সময়ের কথা যা জীবনে আর কখনো ফিরে আসবেনা, প্রবাসে বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন, পরিবারের সবাইকে ছাড়া বছরের পর বছর পার করে ঈদ।

 

প্রবাস জীবনে ঈদ বিগত ঈদগুলোর হাজারো স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। এখানের ঈদে বড়ই মিস করি আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সহ পরিবারের সবাইকে। প্রবাসের ঈদ হচ্ছে কর্মব্যস্ত অন্যান্য দিনের মতই শুরু হয়। ভোর চারটায় গোসলের পর ফজরের নামাজ ও ঈদের নামাজের প্রস্তুতি। আর নামাজের পরই শুরু হয় প্রবাস জীবনের সবচেয়ে অবিচ্ছেদ্য অংশ ঘুম, আর ঈদের দিনেও যাদের ছুটি নেই তাদের প্রতিদিনের মতোই ডিউটি।

 

যাদের বন্ধ তারা অবশ্য অনেকে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি না দিয়ে ছুটে যান কোনো ক্যাফেতে, অনেক দুরে থাকা আপনজনের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার জন্য, শুরু হয় ভাব বিনিময়ের এক মহাক্ষন, আলাপ শুরু হলে আর শেষ হয়না, আপন মনে লুকানো দুঃখ/কষ্ট কাউকে বুঝতে না দিয়ে মা, বাবা সহ আপন মানুষের সাথে ঈদের আনন্দ শেয়ার করে যান হাজারো প্রবাসী। কারন প্রবাসীর কষ্ট প্রবাসী ছাড়া কেউ বুঝবেনা।

 

গরমের কারনে অনেকেই বাসা থেকে বের হননা, তাই বিকাল বেলায় সবাই ছুটে যান বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার জন্য, আড্ডা চলতে থাকে মধ্য রাত পর্যন্ত। লক্ষ বাঙালী আজ বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রবাসে জীবন যাপন করছেন। দেশের জন্য মূল্যবাণ রেমিটেন্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে বেগবান করছেন। বছর ঘুরে তাদের জীবনেও ঈদ আসে। কেমন কাটে তাদের ঈদের দিনটি ? যারা পরিবার পরিজন, আত্মীয়- বন্ধুবান্ধব সবাইকে ছেড়ে প্রবাসে একলা ঈদের দিনটি পালন করেন? কপালের লিখন বলি আর যাই বলি সময়ের প্রবাহে আমিও আজ নিজেকে আবিষ্কার করি প্রবাসী বা রেমিটেন্সযোদ্ধা হিসেবে।

 

বাবা-মা, ভাইবোন, বন্ধু-বান্ধব সর্বপরি নিজের প্রিয় জন্মভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে অনেকেই আজ আমার মতো প্রবাসী। খুব ভোরে (ফজরের নামাজের আধঘন্টা পর) এখানে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নামাজের পর বাঙালীরা নিজেদের মধ্যে সামান্য মিষ্টি বা ঝাল কিছু তৈরী করে কেউ বা ঈদের সেমাইটা বাঙালি রেষ্টুরেন্টে গিয়ে কিনে খায়, তারপর হয়তো কেউ দেশে ফোন করে কথা বলেন প্রিয়জনের সাথে, কেউ বা নিভৃতে বসে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলেন, কেউ হয়তোবা কেঁদে উঠেন। কি ভীষন কষ্টের একটি দিন। কে বলবে আজ ঈদ! এমন দিন যেন চরম শত্রুকেও কেউ না দেয় এই আশাটাই সবাই করে এই দিনে।

 

দেশে কাটানো ঈদগুলো তখন এক একটা স্বর্ণালী মূহুর্ত হয়ে চোখের সামনে ভাসে। তারপরও জীবন থেমে থাকে না। ঈদ আসে ঈদ যায়। কাজের টানে, অর্থের টানে যারা দেশ ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি দিয়েছেন কেবল তারাই জানেন দেশ কী! দেশের প্রতি ভালোবাসা কেমন। শুধু পরিবারের সুখের জন্য বছরের পর বছর তারা কাটিয়ে দেন অজানা দেশে। বাবা-মা, ভাই-বোনের সুন্দর একটা ঈদ উপহার দেওয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যান। ঈদের ছুটি কী তা বেশির ভাগ খেটে খাওয়া প্রবাসীরাই জানেনই না। তারপরও ঈদের দিন মুখে হাসি, হৃদয়ে কষ্ট লুকিয়ে পরিবারের সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান।

 

আমরা যারা প্রবাসে থাকি, তারা বুঝি প্রিয়জন পাশে থাকা কী, প্রিয় মাতৃভূমি কী! তাই কামনা করি যারা দেশে আছেন তারা যেন কাছের মানুষগুলোকে ভালোবেসে আঁকড়ে রাখেন। তাহলেই আমাদের দূর প্রবাসের ঈদ সার্থক হবে। ‘প্রতিটি প্রাণে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক ,প্রতিটি মানব জেগে উঠুক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে প্রতিটি হৃদয় জ্বলে উঠুক ত্যাগের মহিমায়, শুধু ঈদের দিনই নয় এ ত্যাগের শিক্ষা জাগরন হোক প্রতিটি দিন আর তা শুরু হোক এই ঈদ দিয়েই। সকল প্রবাসীদের পক্ষ থেকে ঈদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা।
Headlines
error: আপনি আমাদের লেখা কপি করতে পারবেন নাহ। Email: Info@mirchapter.com
google.com, pub-4867330178459472, DIRECT, f08c47fec0942fa0