করোনা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট -সোহেল তানভীর।

সময়টা বিকাল ঘনিয়ে সন্ধ্যার ঠিক পর পর, কয়েকজন বন্ধু মিলে গ্রামের প্রকৃতির উজ্জ্বল নিদর্শন চাঁদের আলোয় পৃথিবী ঘেরা সমতল ভূমির হালকা উপরিভাগে গভীর অন্ধকারে গাছ গাছালি বেস্টিত পরিবেশে বিধাতার সৃ‌ষ্টি রাজীর একটি অংশ শত শত জোনাকি পোকার দল বেধে জ্বলে উঠার অপরুপ দৃশ্য দেখতে বের হলো।
তারা অবস্থান নিল, রাজপথের মধ্যেভাগে আর রাস্তার দুপাশে ছোট বড় মাঝারি ধরনের অঘোষিত ভাবে বেড়ে উঠা গাছের পাশেই সবুজের সমারোহ বিশাল জমি যা অল্প কিছুদিন আগেই বাংলার প্রকৃত জমিদার কৃষক মামা নিজ হাতে রোপণ করেছেন।অকৃপণ সবুজ শ্যামল গাছের মৃদু বাতাস উপহার পেয়ে মটর বাইকের আলোটা বন্ধ করে অন্ধকারে ছোট ছোট জোনাকির দেয়া শত শত আলো দেখা উপভোগ করতে লাগলো বন্ধুরা। হই হুল্লোড়ে গলা ছেড়ে বেসুরো গলায় ভুলবাল হারানো দিনের গান গেয়েই চলছে।সময়টাকে নিজেদের মতো উপভোগ্য করে বেশ ভালোই কাটছে তাদের। তন্মধ্যে হঠাৎ করেই তথ্যপ্রযুক্তি যুগের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার মোবাইল ফোনে(একজনের) কল বেজে উঠে, রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে একটি মায়াবী কণ্ঠের আওয়াজ বাবা, তুমি কোথায় ?কণ্ঠ শুনে চিনতে বাকি রইলো না যে, এটি একজন সন্তানের জন্য সৃষ্টি কর্তার পক্ষ থেকে পৃথিবীর সেরা উপহার জণম জননী মায়ের কণ্ঠ। বলল মা, এইতো এলাকার আশেপাশেই আছি।
মায়ের নির্দেশ আর বাহিরে থাকা যাবেনা এক্ষুনি বাড়িতে চলে আসো?ছেলে হ্যা সূচক উওর দিয়ে ফোন টা রেখে দিল।অপরুপ দৃশ্য দেখা ইতি টেনে বাড়ির পথে চলতে শুরু করলো মটর বাইকে করে।হঠাৎ করেই রাস্তার বা পাশ থেকে নাম উল্লেখ করে ডাক দিল পরিচিত এক বড় ভাই। বাইক থেকে নেমে চিরচেনা কুশল বিনিময় হলো ।আমাদের পেয়ে দীর্ঘদিনের অদেখা আলাপন শুরু করলো সদ্য প্রবাস ফেরত প্রিয় ভাইটি। স্বল্প আলাপনে অতীত বর্তমানের খবর নিয়ে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা দিয়ে বিদায় জানানো হল।
এর মধ্যে সবাই যে যার মতো করে বাসায় চলে গেলো। রাতে জিসানের সর্দি কাশি দিন পাঁচেক পরে সাথে জ্বর উঠল, পরিবারের সবাই সাধারণ জ্বর ভেবে পাশের ফার্মেসি থেকে নাপা প্যারাসিটামল এনে খাওয়ালো। দিনকে দিন জ্বরের ধরণ এবং শরীরের অবস্থার পরিবর্তন হতে লাগলো। জিসানের বন্ধুদেরও একই অবস্থা।হঠাৎ শরীরের এমন পরিবর্তন নিয়ে কিছু বুঝে উঠার আগেই জানতে পারল কিছুদিন আগে দেখা হওয়া প্রবাস ফেরত ভাইটি ইতিমধ্যেই বর্তমান বিশ্বের আতঙ্কিত করোনা ভাইরাস যা সারা দুনিয়ায় মহামারীতে রুপ নিয়েছে সেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ হসপিটালে চিকিৎসাধীন।
জিসান এবং তার বন্ধুর পরিবার কালক্ষেপন না করে ডাক্তারের শ্বরণাপন্ন হলো।চিকিৎসক জানিয়েছেন তারা প্রত্যেকেই করোনা ভাইরাস কোভিড – ১৯ এ আক্রান্ত। চিকিৎসকেরা সাধ্যমত চেস্টা চালাচ্ছেন তাদের সুস্থ করতে ।মুদ্রার উল্টো পিঠে আবার কেউ কেউ চেস্টা তদবির করেও চিকিৎসা পাচ্ছেনা। পুরো দেশ লকডাউন। সুনশান নিরবতা। দুজন একত্রে হাটা চলা নিষেধ। দেশের এরকম ক্রান্তিকালে চিকিৎসক ,নার্স, সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী, বিজিবি সহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা ও সংস্থার সদস্যরা জীবন বাজী রেখে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন অনবরত। জিসানসহ তাদের পরিবার ও গ্রামের মানুষজন ভীষণ চিন্তিত। সময় অতিবাহিত হলো প্রায় ১৫ দিন।
হঠাৎ করেই গ্রামে খবর আসে জিসানের সাথে আক্রান্ত এক বন্ধু করোনা ভাইরাস কোভিড – ১৯ এ আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে মৃত্যুর পথ যাত্রী হয়ে গেছেন। মূহুর্তেই গ্রাম থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র গুলো নিউজফিডে হেডলাইন করে প্রচার করছে মৃত্যুর সংবাদ। প্রশাসনের লোকজন মৃত ব্যাক্তির বাড়ি পুরো লকডাউন করে দিল।গ্রামের অন্য পরিবার থেকে সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন করা হল।নেই কান্নার মাতম।নেই কোনো আহাজারি। কেউ একজন কাঁদছে কিন্তু তাকে গিয়ে শান্তনা দেওয়ার জন্য কেউ এগিয়ে আসছেনা । এ কেমন মৃত্যু?কেনো কেউ মৃত ব্যাক্তি দূরে থাক ,তার পরিবারের পাশে আসছেনা?ফ্রিজিং এম্বোলেন্স গাড়ি করে অদৃশ্য ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যাক্তির লাশ এসে পৌছালো গ্রামে। কবর দেওয়ার জন্য খুব তাড়াহুড়া শুরু করলো।প্রশাসনের চারজন লোক পিপিই পরিহিত অবস্থায় লাশটাকে কবরে ফেলে মাটিচাপা দিয়ে দিল।একটা লোক পাশে যাওয়ার জন্য উদ্বিগ্ন হলোনা।শত শত লোকের সারিবদ্ধ সমাগম হয়ে কোনো জানাজাও হলোনা।পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত এরকম মৃত্যু গ্রামের লোকজন দেখেননি।
সবাই একেবারে নিশ্চুপ। বড় দুঃখে মানুষ কাদেঁনা মানুষ কাদেঁ ছোট ছোট দুঃখে।এ যেনো সারা দুনিয়ার প্রতিচ্ছবি। নিউইয়র্কের টাইম স্কয়ার শূন্য!লন্ডন ব্রীজে হাঁটছে না মানুষ!পবিত্র কাবার চার পাশে ঘুরছে না মুসলমান!ভেটিক্যানে মানুষবিহীন কবুতর!
ভেনিসের পানিতে ভাসছে না নব দম্পতি আর পর্যটক! নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়ি!
শূন্য গগনে উড়ছে না প্লেন!
সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকছে না আন্তদেশীয় ট্রাক আর বাস!কোন সার্কুলার নেই, নোটিশ নেই তবুও সব কিছুই স্থবির! ইচ্ছা হলেও রাজত্ব দখল করার কারো প্লান নেই!সমগ্র দুনিয়া ব্যাপী বিকট ঝাঁকুনি,
চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিলো,
আমরা সবাই কত অসহায়?
বিনা যুদ্ধে বিনা নোটিশে পুরো পৃথিবী আজ গৃহবন্দী। একেই বলে সৃষ্টি কর্তার রাজত্ব ।বিধাতার রাজ্যে মানব কেবলি অদৃশ্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে আসে।কেউ ভালো কেউ বা মন্দ পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষার রেজাল্ট মৃত্যুর পর নিজ চোখে দেখতে পাবে বিধাতার নোটিশ বোর্ডে। দুনিয়ার রেজাল্ট একজনের টা হয়তো অন্যজন দেখে কিংবা নম্বর দেয় তবে বিধাতার পরীক্ষা বড় আজব।জিসানের বন্ধুর মৃত্যুতে সবুজ শ্যামল পুরো গ্রামটি যেনো হঠাৎ বিজলী চমকানোর মতো করে শ্মশানে পরিনত হলো।এই গ্রামের ন্যায় বর্তমান বিশ্ব আজ থমকে গেছে। এদিকে জিসান ২৫ দিনের ট্রিটমেন্ট নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে ।শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকলে এরকম ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েও সুস্থ হওয়ার নজির আছে।
জিসান তার জলন্ত প্রমাণ। সারা পৃথিবীতে লাশের মিছিল।সাব্বির শিকলবিহীন, পুলিশের সেন্ট্রী বিহীন সেচ্ছায় চার দেয়ালে গৃহবন্দী। অথচ পৃথিবীতে একজন মানুষকে বন্দী করতে কতো কিছুইর না নিয়মাবলী লাগে।আজ পৃথিবীর মানুষগুলো সেচ্ছায় সভ্য জাতির শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে যার যার গৃহে বন্দী জীবন কাটাচ্ছে। দেশের এরকম পরিস্থিতিতে চিকিৎসক গন অল্প সময় পর পর হাত মুখ হ্যান্ড ওয়াস দিয়ে ধৌত করার পরামর্শ দিচ্ছেন।বার বার সচেতন ও সতর্ক করছেন জনগণ কে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন গুলো দিনে আনে দিনে খায় এরকম পরিবারের পাশে দাড়িয়েছে। সরকার সাধ্যমতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। হেকমতে পীর গুজবে বাঙ্গালী হয়ে আবার কেউ কেউ সারা দেশ ব্যাপী ছড়িয়েছে যে, থানকুনি পাতা খেলে করোনা ভাইরাস আসতেই পারবেনা আবার কেউ বা লালসালুর মতো করে দেশের ক্রান্তিকালে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যাস্ত।
তবে করোনা ভাইরাস একটা জিনিস বুঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, জটিল রোগ হলে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা দুনিয়ার সেরা চিকিৎসার কেন্দ্র গুলোতে গিয়ে মানুষ বাচার জন্য লক্ষ কোটি ডলার খরচ করতো আজ সেই দেশগুলো কতটা অসহায় এই ভাইরাসের কাছে। ইতালীর প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়ে লাশের মিছিল নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বলেই বসেছে যে ,মানুষের হাতে যতটুকু ক্ষমতা ছিল তা ব্যবহার করা শেষ আমরা তাকিয়ে আছি আসমানের মালিকের দিকে। গৃহবন্দী জিসান একাকীত্ব হয়ে ভাবছে তার বন্ধুর সাথে কাটানো সোনালী অতীত। কতইনা মধুর সম্পর্কের বেড়াজালে বন্দী ছিল তাদের জীবন। আজ কেউ পাশে নেই। গ্রামের মানুষজন ভয়ে কাছে আসছেনা।কেমন যেনো একটা ভূতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ডাক্তারদের সংস্পর্শে থাকার সুবাদে জিসানের উপলব্ধি হলো এই যে, জনসচেতনতার বিকল্প নেই এদেশের জনগণের জন্যে।সৃষ্টি কর্তার দয়া এবং জনগণের সতর্কতা ও সচেতনতাই পারে এই ভয়াবহ মহামারী থেকে মুক্তি পেতে।যদি অবহেলায় করোনা ভাইরাস কে ভাসিয়ে দিতে চায় এদেশের জনগণ তাহলে মনে রাখতে হবে, অন্ধ হলেও প্রলয় কিন্তু বন্ধ থাকেনা।
বিঃদ্রঃ :গল্পটি সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে কাল্পনিক চরিত্রের উপর লেখা।
লেখক : সোহেল তানভীর
ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
মাস্টার্স
ঢাকা কলেজ, ঢাকা।