বিদায় বেলায় ভালোবাসা গ্রহণ করো প্রিয় ক্যাম্পাস।

blog
স্কুলে পড়ার সময় স্কুলের স্যারেরা জিজ্ঞেস করতো বড় হয়ে কি হবে?????
তখন জীবন মানে কি তাই-ই ভালো করে জানতাম না।, তারপরেও স্যারের প্রশ্নের জবাব দিতে মুখ ফুটেই বের হয়ে যেত স্যার ইঞ্জিনিয়ার হবো। আসলে ইঞ্জিনিয়ার কি বা তাদের কাজ কি তা ভালো করে জানতাম-ই না। শুধু জানতাম ইঞ্জিনিয়ারদের অনেক নাম অনেক টাকা। আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষই মনে হয় টাকা উপার্জনের জন্য লেখাপড়া করে। তারমাঝে আমিও একজন।
আমার মনে হলো কেন যে ইঞ্জিনিয়ারদের অনেক টাকা।  হয়তো আমার ভিতরেও পরিবেশগত কারণে টাকার চিন্তাটা প্রবেশ করে ফেলেছে। স্কুল জীবনেতো টাকা উপার্জন এর চিন্তা মাথায় আসার কথা না।
যাক বাদ দেই এসব কথা, লেখাটা অনেক বড়, লেখার বাক্যগুলো  ও লেখার মতো এত বড় কষ্টের, এভাবে লেখতে হবে কোনদিন ও ভাবি নি। লেখার মাঝে অনেকবার নিরবে কান্না ও করেছি। হয়তো শিখতেছি জীবন কি,  পরিস্থিতি কি, বাস্তবতা কি?
স্কুল জীবনের মুখে বলা স্বপ্নটা মনে হয় আল্লহতায়লা কবুল করে নিয়েছেন।
ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার আসায় ভর্তি হওয়া সিসিএন ক্যাম্পাসে।
এখানেই জীবনের শুরু, জীবনের সুখ-দুঃখের সাথী হওয়া। কোনটা সুখের কান্না কোনটা দুঃখের কান্না।
সিসিএন ক্যাম্পাসে ভর্তি হওয়ার পর নিজের বাবা-মা, ভাই-বোন বন্ধু-বন্ধবী, আত্নীয়-স্বজন নিজের এলাকার মায়া ত্যাগ করে বিদ্যা অর্জনের উদ্দেশ্যে কুমিল্লায় আসা।
মনে মনে খুশি লাগলেও সবাইকে ছেড়ে আসার সময় কেন যেন চোখের কোণে পানি জমা হচ্ছিলো। বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা কষ্ট জমা হতে লাগলো। তারপরেও সকল কষ্ট নিয়ে চলে আসলাম কুমিল্লায়।
নিজের এলাকার বড় ভাই থাকাতে কুমিল্লায় আমার থাকার জায়গা ম্যানেজ করতে বেগ পেতে হলো না। সব কিছু উনি নিজে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছেন।
কুমিল্লার কোটবাড়িতে একটি মেসে উঠা। কোটবাড়িতে আগে একবার এসেছিলাম সিসিএন পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট এ ভর্তি হওয়ার কাগজপত্র নিয়ে, ভর্তি হয়ে সোজা বাসায় চলে আসলাম, তেমন ঘুরাঘুরি হয় নি কোটবাড়ি তে।
মেসে এসে পরিচয় দিলাম, মেসের সবাই তখন বড় ভাই, কেউ সিসিএন পলিটেকনিক আবার কেউ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্র। সবাই খুব সাদরেই আমাকে গ্রহণ করলো। প্রথমদিনেই বুঝতে পেরেছিলাম বড় ভাইয়ারা অনেক ভালো।
আমি যেদিন মেসে উঠেছিলাম সেদিন শুধু আমি একজন ই সবার ছোট ছিলাম। তখন নিজেকে কেমন যেন বেমানান লাগছে, নিজেকে ম্যাচিং করে নিতে পারছি  না। শুধু মন খারাপ থাকতো, বাবা-মা, ভাই, সবাইর কথা মনে হতো। বড় ভাইয়ারা আমার অবস্থা বুঝতে পেরে আমাকে অনেক বুঝালো,  বিকেলে আমাকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে বের হলো কোটবাড়ির মোটামুটি সকল জায়গায় ঘুরে দেখালো।
আস্তে আস্তে আমার কাছে মেস লাইফ ভালো লাগতে শুরু হলো।
কিছুদিন পর মেসে কয়েকজন নতুন সদস্যের আগমণ লক্ষ্য করলাম। জানতে পারলাম ওরা আমার একই ইন্সটিটিউট এ ভর্তি হয়েছে, শুনে মনে অনেক আনন্দবোধ পেলাম। আস্তে আস্তে সবাই সবার পরিচিত হয়ে গেলাম। এক সাথে ইন্সটিটিউট এ যাওয়া-আসা, খাওয়া,  দুষ্টুমি সব কিছুতেই আমরা সবাই মিলে ছিলাম। আস্তে আস্তে একে অন্যের বন্ধু । অনেক মজা করতাম আমরা।
এভাবে আমাদের দুই সেমিস্টার শেষ হয়ে গেলো।
কোন এক কারণবশত মেস থেকে আমি সিসিএন হোস্টেল এ চলে আসলাম।
হোস্টেলে সিট নিতেও তেমন বেগ পেতে হয় নি। কারণ আমার ডিপার্টমেন্ট এর খুব ঘণিষ্ঠ বন্ধু শামীম হোস্টেল সুপার থেকে সবকিছু বুঝে নিয়ে আমাকে হোস্টেলে নিয়ে আসে। কিছুদিন আমি শামীমের বেড-ই ছিলাম। ১০৪ নাম্বার রুমে আমার প্রথম থাকা। অবশ্য ১০৪ নাম্বার রুমে বন্ধু শামীমের বেড ছিলো। কিছুদিন যাওয়ার পর বন্ধু শামীম ২০৩ নাম্বার রুমে সিট পেয়ে যায়। ২০৩ নাম্বার রুমেই শামীম থাকে আর আমি ১০৪ নাম্বার রুমে।
হোস্টেলে আসার পর তেমন খারাপ লাগে নি, কারণ আমার কলেজের সবাইকে একসাথে পেয়েছি, সবার সাথে আমার মোটামুটি ভালো পরিচয় ছিলো। হোস্টেল এর সবাইও আমাকে খুব সাদরে গ্রহণ করলো। মোটামুটি হোস্টেল লাইফের প্রথম দিনটা খুব ভালোভাবে চলে গেলো।
কিন্তু বিপত্তি ঘটলো পরদিন থেকে। হোস্টেল এর কিছু নিয়ম-কানুন ছিলো, সিনিয়র- জুনিয়র একটা ব্যাপার ছিলো। মোটকথা মেস লাইফ থেকে হোস্টেল লাইফ অনেকটা মোডিফাইড। মেসের মতো অবাধে চলাফেরা করা যায় না। ইচ্ছে করলেই যা খুশি করা যায় না। তখন থেকে একটু খারাপ -ই লাগলো।
আস্তে আস্তে এইগুলোও মানিয়ে নিতে সক্ষত হলাম।
বড়ভাইদের সম্মান করা, অবশ্য একটা মজার ব্যাপার হোস্টেল এ লক্ষ্য করা যায় যে, সিনিয়র ভাইয়াদের সম্মান করলে উনারা অনেক খুশি হতেন।
ধীরে ধীরে সিনিয়র ভাইয়াদের সাথেও পরিচিত হয়ে গেলাম। হোস্টেল লাইফে একটা জিনিস খুব লক্ষ্য করার মতো।
সিনিয়র ভাইয়ারা কখনো একটা জুনিয়র এর উপর এমনেই হাত তুলেন না। সিনিয়ররা চায়, যেন  জুনিয়রটি সঠিক পথে চলুক। সিনিয়রা জুনিয়রদের অনেক আদর করে। সিসিএন হোস্টেল এ এই জিনিসটায় অনেক ভালো লাগে। হোস্টেল লাইফে সিনিয়রদের যেন জুনিয়রদের সঠিক পথ দেখানো একটা প্রতিদিনের রুটিনের মতো হয়ে গেছিলো। এভাবে দেখতে দেখতে ৬ টি সেমিস্টার শেষ হয়ে গেলো।  আমরা জুনিয়ররা কলেজের মোস্ট সিনিয়রদের আওতায় পরে গেলাম। নিজেকে একটু এখন ফ্রিলি উপভোগ করতে লাগলাম। নিজের মধ্যেও একটা ম্যাচোয়েরিটি চলে আসলো। সিনিয়র ভাইয়াদের মতোও আমরা যারা মোস্ট সিনিয়র হোস্টেলে থাকি,   জুনিয়রদের সুবিধা-অসুবিধা, ভালো-মন্দ দেখাশুনা করতে লাগলাম। খুব ভালোভাবেই চলছে সিসিএন হোস্টেল।
দেখতে দেখতে বিদায়ী ঘণ্টা বেজে গেলো ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নেওয়ার। মনের মধ্যে কেমন যেন একটা ফাপা কষ্ট শুরু হয়ে গেলো ।
১৭-০৫-২০১৭ দিনটি ছিলো আমাদের জন্য খুবই দুঃখের ও আনন্দের। এই দিনটি আমাদের র‌্যাগ ডে।
র্যাগ-ডের অনুভূতি বলে বা লিখে প্রকাশ করা যাবে না। এ যেন আনন্দ-বেদনার মহাকাব্য, যেন মহাকালের প্রতি নতুন অনিচ্ছা যাত্রা। বিদায় লগনে মনের গহীনে শুধু একটাই সুর, অব্যক্ত ব্যাকুলতা আর অভিমানী সংশয়, আবার দেখা হবে তো?
সারাদিনের আনন্দময় সময়ই হয়তো কাম্য ছিল। সর্বোপরি সত্যিই প্রচণ্ড মিস করব এ সব দিন, সুন্দর মুহূর্ত, স্মৃতিময় ক্যাম্পাস, মমতাময়ী শিক্ষকগণ আর সম্ভাবনায় রাঙানো মুখগুলো। মিস করব চায়ের টঙের আড্ডা আর স্নেহশীষ ছোটদের প্রিয় খুনসুটিগুলোও। ভালো থাকুক প্রিয় ক্যাম্পাস।
জীবনের সবচেয়ে আনন্দ ও সবচেয়ে বেদনার দিন হচ্ছে র্যাগ-ডে। যেদিন ক্যাম্পাসে কাটানো প্রিয়গুলো করুণ ভায়োলিনের সুরে একেকটা তীরের মত বুকে বিদ্ধ হয়। আর মুখে হাসি নিয়ে আনন্দ করে যেতে হয় পুরোটা দিন।
ভালো থাকুক প্রিয় সিসিএন ক্যাম্পাস। ভালোবাসি প্রিয় ক্যাম্পাস।
মীর সজিব
সিসিএন পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট
print

Hits: 268

কমেন্ট করুন