পক্ষপাতহীন মায়ের গল্প- সুমাইয়া আক্তার বৃষ্টি।

পক্ষপাতহীন মায়ের গল্প- সুমাইয়া আক্তার বৃষ্টি।

সকাল থেকেই ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। ঘুম ভাঙলো পাঁচ সন্তানের জননী আমেনার “ও আল্লাগো,ও খোদাগো, আমার পোলারে নিও না!আমার পোলারে দিয়া যাও” এই বিলাপ শুনে। বুঝলাম হয়তো তার কোন সন্তানের শরীর খারাপ করেছে। বেরিয়ে দেখলাম তা ই।
আমেনার অভাবের সংসারে পাঁচ সন্তানের মধ্যে একটি ছেলে প্রতিবন্ধী। তার সন্তানদের প্রতি তার যেই মায়া মমতা, তার এক ছিটেফোঁটা ও নেই তার স্বামীর মধ্যে। তার আচরণ দেখলে মনে হয় সন্তানদের জন্মদাতা হয়েই যেন তার দায়িত্ব শেষ। সন্তানদের স্নেহ দিয়ে আগলিয়ে রাখা, তাদের চাহিদা, ছোট খাটো আবদার সকল কিছু মেটানোর দায়িত্ব যেন কেবল তারই।

 

তার প্রতিবন্ধী ছেলেটি কিছুদিন ধরেই অসুস্থ। যদিও সে তার স্বামীকে বলেছে ছেলেটির জন্য ঔষধ আনতে কিন্তু সেই ব্যপারে তার স্বামীর কোন ভ্রুক্ষেপ ই নেই।
ছেলেটি আজ বেশি অসুস্থ হয়ে পরেছে। কোন উপায়ন্তর না পেয়ে আমেনা তার ছেলেটিকে নিয়ে বাহিরে কাদায় বসেই আকাশের দিকে দুটো হাত তুলে জোরে জোরে চিৎকার করে খোদার কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছে যেন তার সন্তানকে খোদা জীবন ভীক্ষা দেন।দেখলাম সেই ছেলেটির শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। তার ঠোঁট মুখ নীল বর্ণ হয়ে গেছে, চোখের মণি গুলো ও স্থির নেই,হাত পা শক্ত হয়ে গেছে।আমেনা উঠোনে কাদায় বসেই আস্ফালন করছে। তার একেবারেই খেয়াল নেই যে সে কাদায় বসে আছে, তার শরীরের বসন ও কিছুটা এলোমেলো অবস্থা হয়ে আছে সেদিকেও তার খেয়াল নেই।সন্তানের সংকটাপন্ন অবস্থায় হয়তো স্বভাবতই প্রতিটি মা ই এরকমই নিজের কোন বিষয়ের প্রতি বেখেয়ালি হয়ে পরে, আর এদিক থেকে আমেনার ক্ষেত্রেও কোন ব্যতিক্রম দেখলাম না। সে কাদায় বসেই তার আল্লার কাছে ফরিয়াদ করছে, বলছে “আমারে নিয়ে নেও আল্লা, আমার পরাণের বদলি আমার পোলার পরাণ ভিক্ষা দেও”…।

 

বৃষ্টি থেমে গেছে। জল ঝরাতে ঝরাতে মেঘদেবতাও যেন ক্লান্ত হয়ে পরেছে। কিন্ত আমেনার দুচোখের সাগর থেকে অনবরত জল বেরিয়েই চলেছে। তার চোখজোড়া যেন ক্লান্ত হতে জানে না। মায়েরা যেন ক্লান্ত হতে জানে না।মায়েদের ক্লান্ত হতে নেই। সন্তানের সুস্থতার জন্য তারা নিজের জীবন সপে দিতেও রাজি। হউক সেই সন্তান উপার্জনক্ষম কিংবা তার জন্য বোঝা।
একজন সুস্থ,স্বাভাবিক সন্তানের অসুস্থতায় একজনের মায়ের যেই আস্ফালন তার কিছু পরিমাণ ব্যতিক্রমও দেখলাম না আমেনা প্রতিবন্ধী, উপার্জনঅক্ষম সন্তানটির অসুস্থতায় তার আস্ফালনে।
অনুধাবন করলাম ভবিষ্যতে উপার্জনঅক্ষম এই সন্তানের উপার্জনক্ষমতা নয়, সন্তানের জীবনটাই তার কাছে মুখ্য।
তার আর চারটি সন্তানের মতোই এই অকর্মণ্য ছেলেটিও যেন সমমানের তার কাছে। সন্তানদের প্রতি তার ভালোবাসায় কোন পক্ষপাতের অস্তিত্ব নেই। তা হয়তো থাকে না পৃথিবীর কোন মা এর ই।

 

মা হিসেবে তার এই পক্ষপাতহীন ভালোবাসা দেখে মনে মনে কামনা করলাম মায়ের প্রাপ্য সম্মান প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে ভালো থাকুক পৃথিবীর প্রতিটি মা।
Headlines
error: আপনি আমাদের লেখা কপি করতে পারবেন নাহ। Email: Info@mirchapter.com