বাংলাকে বিসর্জন- শুভ্র ভৌমিক জয়।

জীবনের ঠিক তৃনমূল থেকেই‌ প্রতিটি মানুষের ভাষা ব্যবহারের প্রয়োজন রয়েছে। ভাষা ব্যবহারের প্রধান কারনই হলো মানুষ মানুষের নিজের মনের ভাবটুকুকে অন্যের নিকট প্রকাশ করা। পৃথিবীতে অধিকসংখ্যক ভাষার ব্যবহার রয়েছে। তার মধ্যে বাংলা ভাষা পৃথিবীর বুকে অবস্থানরত বেশ কয়েকটি দেশে ঠাঁই করে নিয়েছে। শুধু ঠাঁই‌ করে নিয়েছে বললেও‌ আমি ভুল বলবো। কারন বাংলা ভাষার সুবিশাল একটু ইতিহাত রয়েছে । সেই ইতিহাসের উপরে ভার করেই বাংলা ভাষা আজ বিশ্ব সমাজে মাথা উঁচু করে ঠাঁই নিয়েছে। বাংলা ভাষার সঠিক ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যায়……
বাংলা ভাষা বিকাশের দিনগুলো ১৩০০ বছর পুরনো। চর্যাপদ এ ভাষার আদি নিদর্শন। অষ্টম শতক থেকে বাংলায় রচিত সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারের মধ্য দিয়ে অষ্টাদশ শতকের শেষে এসে বাংলা ভাষা তার বর্তমান রূপ পরিগ্রহণ করে। বাংলা ভাষার লিপি হল বাংলা লিপি। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত বাংলা ভাষার মধ্যে শব্দগত ও উচ্চারণগত সামান্য পার্থক্য রয়েছে। বাংলার নবজাগরণে ও বাংলার সাংস্কৃতিক বিবিধতাকে এক সূত্রে গ্রন্থনে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে তথা বাংলাদেশ গঠনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব বাংলায় সংগঠিত বাংলা ভাষা আন্দোলন এই ভাষার সাথে বাঙালি অস্তিত্বের যোগসূত্র স্থাপন করেছে। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদী ছাত্র ও আন্দোলনকারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষাকরণের দাবীতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইন বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রীয় কাজে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। ১৯৫২’র ভাষা শহিদদের সংগ্রামের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
বাংলা ভাষার ইতিহাসকে সাধারণত তিনটি ভাগে বিভক্ত করে থাকি। প্রাচীন বাংলা সাধারনত ৯০০/১০০০ থেকে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। চর্যাপদ, ভক্তিমূলক গান এই সময়কার লিখিত নিদর্শন। এই সময় আমি, তুমি ইত্যাদি সর্বনাম এবং -ইলা, -ইবা, ইত্যাদি ক্রিয়াবিভক্তির আবির্ভাব ঘটে।
মধ্য বাংলা সাধারণত ১৪০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ধরা হয়ে থাকে। এ সময়কার গুরুত্বপূর্ণ লিখিত নিদর্শন চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ইত্যাদি। শব্দের শেষে “অ” ধ্বনির বিলোপ, যৌগিক ক্রিয়ার প্রচলন, ফার্সি ভাষার প্রভাব এই সময়ের সাহিত্যে লক্ষ্য করা যায়। কোনো কোনো ভাষাবিদ এই যুগকে আদি ও অন্ত্য এই দুই ভাগে ভাগ করেন।
আধুনিক বাংলা ভাষাকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান সময়কে ধরা হয়ে থাকে। এই সময় ক্রিয়া ও সর্বনামের সংক্ষেপণ ঘটে, যেমন তাহার থেকে তার; করিয়াছিল থেকে করেছিল।
খ্রিস্টীয় দশম দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়কালে মাগধী প্রাকৃত ও পালির মতো পূর্ব মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষাসমূহ থেকে বাংলা ও অন্যান্য পূর্ব ইন্দো-আর্য ভাষাগুলির উদ্ভব ঘটে। এই অঞ্চলে কথ্য ভাষা প্রথম সহস্রাব্দে মাগধী প্রাকৃত বা অর্ধমাগধী ভাষায় বিবর্তিত হয়। খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীর শুরুতে উত্তর ভারতের অন্যান্য প্রাকৃত ভাষার মতোই মাগধী প্রাকৃত থেকে অপভ্রংশ ভাষাগুলির উদ্ভব ঘটে। পূর্বী অপভ্রংশ বা অবহট্‌ঠ নামক পূর্ব উপমহাদেশের স্থানীয় অপভ্রংশ ভাষাগুলি ধীরে ধীরে আঞ্চলিক কথ্য ভাষায় বিবর্তিত হয়, যা মূলতঃ ওড়িয়া ভাষা, বাংলা-অসমীয়া ও বিহারী ভাষাসমূহের জন্ম দেয়। কোনো কোনো ভাষাবিদ ৫০০ খ্রিষ্টাব্দে এই তিন ভাষার জন্ম বলে মনে করলেও এই ভাষাটি তখন পর্যন্ত কোনো সুস্থির রূপ ধারণ করেনি; সে সময় এর বিভিন্ন লিখিত ও ঔপভাষিক রূপ পাশাপাশি বিদ্যমান ছিল। যেমন, ধারণা করা হয়, আনুমানিক ষষ্ঠ শতাব্দীতে মাগধী অপভ্রংশ থেকে অবহট্‌ঠের উদ্ভব ঘটে, যা প্রাক-বাংলা ভাষাগুলির সঙ্গে কিছু সময় ধরে সহাবস্থান করছিল।
চৈতন্য মহাপ্রভুর যুগে ও বাংলার নবজাগরণের সময় বাংলা সাহিত্য সংস্কৃত ভাষা দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিল। সংস্কৃত থেকে যে সমস্ত শব্দ বাংলা ভাষায় যোগ করা হয়, তাদের উচ্চারণ অন্যান্য বাংলা রীতি মেনে পরিবর্তিত হলেও সংস্কৃত বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়।
বাংলা সালতানাতের সময়কার রৌপ্যমুদ্রা বাংলা ভাষার ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেন বাংলার মুসলিম শাসকগোষ্ঠী। ফার্সির পাশাপাশি বাংলাও বাংলার সালতানাতের দাফতরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত ছিলো এবং ব্যাপক হারে ব্যবহার হতো। এছাড়াও প্রত্ন বাংলা ছিলো পাল এবং সেন সাম্রাজ্যের প্রধান ভাষা।
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে নদিয়া অঞ্চলে প্রচলিত পশ্চিম-মধ্য বাংলা কথ্য ভাষার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক বাংলা সাহিত্য গড়ে ওঠে। বিভিন্ন আঞ্চলিক কথ্য বাংলা ভাষা ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ব্যবহৃত ভাষার মধে অনেকখানি পার্থক্য রয়েছে।[২৫] আধুনিক বাংলা শব্দভাণ্ডারে মাগধী প্রাকৃত, পালি, সংস্কৃত, ফার্সি, আরবি ভাষা এবং অস্ট্রো-এশীয় ভাষাসমূহ সহ অন্যান্য ভাষা পরিবারের শব্দ স্থান পেয়েছে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে বাংলা ব্যাকরণ রচনার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ১৭৩৪ থেকে ১৭৪২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ভাওয়াল জমিদারীতে কর্মরত অবস্থায় পর্তুগিজ খ্রিস্টান পুরোহিত ও ধর্মপ্রচারক ম্যানুয়েল দ্য আসুম্পসাও সর্বপ্রথম ভোকাবোলারিও এম ইডিওমা বেঙ্গালা, এ পোর্তুগুয়েজ ডিভিডিডো এম দুয়াস পার্তেস (পর্তুগিজ: Vocabolario em idioma Bengalla, e Portuguez dividido em duas partes) নামক বাংলা ভাষার অভিধান ও ব্যাকরণ রচনা করেন। ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড নামক এক ইংরেজ ব্যাকরণবিদ আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ (ইংরেজি: A Grammar of the Bengal Language) নামক গ্রন্থে একটি আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন, যেখানে ছাপাখানার বাংলা হরফ প্রথম ব্যবহৃত হয়। বাঙালি সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহন রায় ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে গ্র্যামার অফ্ দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ্ (ইংরেজি: Grammar of the Bengali Language) নামক একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন।
কাল ক্রমে বাংলা ভাষা ইতিহাস ও সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে এক সুদর্শন ও ঐতিহাসিক ভাষা হিসেবে বিশ্বসভ্যতায় ঠাঁই করে নিয়েছে।
কিন্তু আধুনিক যুগে বাংলা ভাষায় কিছু বিশাল পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। যা সাধারনত ভাষা ব্যবহারের উপর অনেকংশে ক্রিয়া করে থাকে।কালক্রমে এই ভাষার যেমন নাম পরিবর্তন হয়েছে ঠিক তেমনি তার দিকও‌ পরিবর্তন হয়েছে।
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা । এ ভাষার জন্য সালাম, জব্বার, রফিক, বরকত বুকের রক্ত ঢেলেছেন। তারা বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু এই গর্ব ও সম্মানের ইতিহাস দুঃখজনকভাবে আমরা বিস্মৃত হতে চলেছি। বিশেষ করে বিগত কয়েক বছরে বাংলা ভাষা ও বানান নিয়ে যে নৈরাজ্য চলছে, তাতে কেবল বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা বা উদাসীনতাই প্রকাশ পায় না, একই সঙ্গে ভাষার নিয়মশৃঙ্খলা সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতাও পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভুলভাবে বাংলা উচ্চারণ ও বানানের যে উৎসব চলছে, তাতে মনে হচ্ছে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, একভাবে উচ্চারণ করলেই হলো কিংবা যে কোন বানানে লিখলেই হলো। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে শুদ্ধ উচ্চারণ ও বাংলা বানান ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হবে একদিন।
আমরা নিশ্চয়ই আমাদের মাতৃভাষাকে ভালোবাসি। তবে সেই ভালোবাসার মর্যাদা রক্ষা করাও জরুরি। আর মর্যাদা রক্ষা হবে তখনই যখন আমরা বাংলা বানান ও এর শুদ্ধ উচ্চারণ সম্পর্কে সচেতন হব। একটু সতর্ক ও যত্নবান হলে শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলা ও শুদ্ধ বানানে বাংলা লেখা খুব কঠিন কিছু নয়।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলা শব্দের উচ্চারণ ও বানানে অধিক সতর্ক থাকার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, প্রথমে মাতৃভাষা শিখতে হবে, তারপর অন্য ভাষা শিখতে হবে। তরুণ প্রজন্মের অহেতুক এই ইংরেজি প্রেম ও বাংলার সঙ্গে ইংরেজির মিশেলে বিচিত্র ভাষায় কথা বলার ব্যাপারে বাংলা ভাষাকে অধিকংশে উৎকণ্ঠা হিসেবে প্রকাশ করা হচ্ছে।
বাস্তবিকই আমরা দেখছি বানান, উচ্চারণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে এখন চরম বিশৃঙ্খলা। সংবাদপত্রের পাতায়, পোস্টার-বিজ্ঞাপন-সাইনবোর্ডে, বেতার-টেলিভিশনে অপপ্রয়োগ ও বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। টেলিভিশন নাটক, এফএম বেতার থেকে শুরু করে সামাজিক মাধ্যমে প্রমিত ভাষার ব্যবহার বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বাংরেজিতে কথা না বলাই হলো বাংলা ভাষার প্রতি প্রথম সর্ম্মান গেপন করা।
অনেক ক্ষেত্রেই অজ্ঞতার কারণে অপপ্রয়োগের ঘটনা ঘটে থাকে। তবে যারা লেখক তাদের সচেতনতা এক্ষেত্রে খুবই জরুরি। কেননা, তার লেখা পাঠ করে অনেক মানুষ প্রভাবিত হয়, প্রভাবিত হয় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বলার সময় আমরা যেভাবেই বলি না কেন, লেখার সময় অবশ্যই সতর্ক থাকা প্রয়োজন, অবশ্যই শুদ্ধতা ও পরিশীলনের ছাপ থাকা প্রয়োজন। আঞ্চলিক ভাষা কিংবা নাগরিক কথ্য ভাষা টিভিতে ব্যবহার হতে পারে কিন্তু সেটাও যেন হয় প্রয়োজনানুসারে অবিকৃতরূপে।
সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদেরকে ভাষার সুষ্ঠু ব্যবহারে যত্নবান হতে হবে। কারণ, যেকোনো মাধ্যমেই একের ব্যবহৃত ভাষা দ্বারা অন্যে প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষত, যেসব মাধ্যম জনপ্রিয় তাদের এ বিষয়ে সচেতন থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রত্যেকেই স্ব-স্ব অবস্থান থেকে এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হলে শৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমে বাংলাকে বিসর্জনের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
আমার লেখায় বাংলা ভাষার ব্যবহারে যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে তাহলে তা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আর ভাষার ইতিহাস ও সভ্যতাকে মনে রেখে বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করুন। অবশেষে বলতে চাই,
বাংলাতে মোর কাব্য শক্তি;
বাংলাতে মোদের গান।
বাংলা আমার প্রতিবাদী শক্তি;
বাংলাই মোদের জীবন যুদ্ধে…
সব থেকে বড় সম্মান ।।
বাংলাকে যোগ্য সর্ম্মান দেওয়ার জন্য সঠিক উচ্চারণে বাংলা ভাষা ব্যবহার করাটাই হলো প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া। বাংলাকে জানাই‌ আমার শত কোটি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
এই বাংলা ভাষা টিকে রবে বহু কাল;
বাংলাকে জানাই তার যোগ্য সর্ম্মান।।
💝স্যালুড প্রিয় বাংলা💝