ফরমাল ইন Formal in – শুভ্র ভৌমিক জয়।

প্রাণ প্রিয় শহরটাকে ছেড়ে এসেছি দিন পনেরো হলো। আজ আমি নিজ-সপ্ন পূরনের উদ্দেশ্যে পর্যটন নগরী গাজীপুরে অবস্থানরত। ইঞ্জিনিয়ারিং জীবনের চার বছর অতিবাহিত হওয়ার অধ্যায়ের সর্বশেষ পর্ব এটি। তাই জীবনের এই অধ্যায়ের পরি-সমাপ্তির লক্ষ্যে প্রিয় বন্ধুকে নিয়ে শিল্প নগরীতে পা রাখা।
এই নগরীতে কেউ আসে বাবা না থাকা পরিবারকে বাঁচাতে কেউ বা আসে দুমুঠো খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে। আবার হয়তো কেউবা আসে আমাদের মতো আকাশ ভরা সুবিশাল সপ্ন পূরনের লক্ষ্য নিয়ে। এই নগরী কারোর জন্য হাতটা বাড়িয়ে দেয় আর কাউকে দেয়ালে পিঠ ঠ্যাঁকানোর জায়গা পর্যন্ত দেয় না। কারোর কাছে এই শহর বড় নিষ্টুর আবার কারো কাছে এই শহর যেন সোনার ডিম পাড়া এক হাঁস।
দিন পনেরো আগে এই নগরীতে আসার পর যোগ্যতার বিচারে আসা এই বস্ত্র শিল্পালয়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম,
আজ নিজ লক্ষ্য আর তোমার মাঝে ঠাঁই খোঁজার উদ্দেশ্যে প্রিয় জন্ম-ভূমি আর কাছের মানুষগুলোকে ত্যাগ করে আসলাম। কিন্তু দেখো তুমি কতটা নিষ্ঠুর আজ তোমাতে ঠাঁই নেয়ার অপেক্ষায় থাকা আমরা এতোটাই একাকি যে আমাদের জন্য প্রিয় জন্ম-ভূমি বিশাদ হয়ে থাকলেও তুমি স্বাগত জানাওনি। দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ভাবতে লাগলাম তোমার ধর্মটা হয়তো এমনই। কি আর করার….
১৭ই ফেব্রুয়ারি
সাল ২০২০
বস্ত্র প্রকৌশলী বিদ্যা সম্পূর্ন করার যে লক্ষ্য নিয়ে গাজীপুরে অবস্থান করছি সেই লক্ষ্য আজ ১৫ তম দিনে বহমান। আজ আমরা এক নতুন শিল্পালয়ের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে রওনা হলাম। আমরা যে গ্রুপে যোগদান করেছিলাম তার আরেকটি শিল্পালয় আমাদের বাসা থেকে বেশ অনেকটা দূরে।আজ সেইখানেই প্রথমে বাস বা ভ্যান যোগে এবং পরে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে পাড়ি দিতে হলো।
এখন সময় সকাল ৮ বেজে ০১ মিনিট।
অনুমতি সাপেক্ষে শিল্পালয়ের গেইট পাস করলাম। সেইখানে থাকা সিকিউরিটিগন দাঁড়িয়ে আমাদের সম্মান জানালো। আমরা এক প্রকার সংকোচ নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম।
ভেতরে সিকিউরিটিগনদের মধ্য থেকে একজন আমাদেরকে শিল্পালয়ের এডমিন অফিসে পৌঁছে দিলো। সেইখানে সকল ফর্মালিটি সম্পূর্ন করে আমাদেরকে শিল্প প্রসেস পর্যবেক্ষনের অনুমতি প্রদান করা হলো। আমরা সেইখান থেকে স্যারকে সম্মান জানিয়ে শিল্প-প্রসেসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরলাম। গেইট পাস করার সময় সেইখানে আরেক সিকিউরিটি আমাদের স্যালুড জানিয়ে স্বাগতম জানালো। আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম আর স্যারদের সাথে পরিচয় পর্ব সম্পূর্ন করলাম। সকলের অনুমতি সাপেক্ষে প্রসেস সূচনা করলাম।
চলতে চলতে দিনের মধ্য-প্রহরে পা রাখলাম। সূর্য এখন সম্পূর্ন মাথার উপরে। ক্ষিদায় সব কিছুই এক প্রকার বিরক্তিকর লাগছে। তখন দুপুর প্রায় একটা। দুই গেইট পাস সম্পূর্ন করে কোনো রকম উত্তাপ থেকে বেড়িয়ে খোলা আকাশের নিছে আসলাম। এখান থেকে বাসায় যাওয়া সম্ভব নয় তবে আসে-পাশে খাবার হোটেলও তেমন দেখতে পারছি না। কিছু দূর হাঁটতেই পেলাম একটি ঘরোয়া পরিবেশের হোটেল। শিল্পালয়ের প্রায় সবাই এখানে খাবার খায়। আমরা ফ্রেশ হয়ে ভিতরে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসে পড়লাম। দুজনই সিঙ্গারা আর পুড়ি অর্ডার করলাম।
ভাবছেন এই ভর দুপুরে কেনো এমন নাস্তা জাতীয় খাবার?
আসলে জীবন যখন জীবনের জায়গা থেকে সত্যিটা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তখন আর
লাগাম ছাড়া চলা যায় না।
খাবার খাচ্ছি আর কথা বলছি বন্ধুর সাথে।
হঠ্যাৎই সেই হোটেলে একজন সিকিউরিটি কার্ডের প্রবেশ। ফ্রেশ হয়ে আমাদের পাশে টেবিলেই বসে পড়লো আর আমাদের খাবারের দিকে লক্ষ্য করেই বলতে লাগলো,
-> মনে কিছু নিবেন না আপনারা আমার ছেলের মতোই দেখতে তাই আপনাদের আঙ্কেল বলে সম্মোধন করছি!!!
আচ্ছা আঙ্কেল, এই খাবার খেয়ে কি পেট ভরে?দুপুরে এগুলো কেনো!?
আমরা সজ্জিত হাসিতে জবাব দিলাম, আঙ্কেল এইতো বাসায় যেতে পারছি নাতো তাই একটু হালকা নাস্তা আর কি;
ক্লান্তির ছাপকে গাঁ থেকে মুছে তিনি খাবার অর্ডার করতেছেন। দেখলাম টেবিলে ১০টার ভাতের সাথে পানি মিশিয়ে খাবার খাওয়া শুরু করলেন। এক পর্যায়ে অবাক হয়ে প্রশ্ন করতে বাধ্য হলাম। আঙ্কেল!!! এমনটা কেনো?
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো! আঙ্কেল, আমি আবুল কালাম আজাদ। একটা সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় ছিলাম। আজ ১২ বছর হলো আমি অবসর গ্রহন করলাম। আমার পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী আমি। তাই আজ সিকিউরিটির কাজে কর্মরত। আমার দেশের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার কোনো এক গ্রামীন কুঁড়ে ঘরে। আমার ছোট ছেলেটা বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর বড় মেয়েকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর বিয়ে দিয়েছি। সেই বিয়ে দেওয়ার সময় অবসরের থেকে পাওয়া মাসে ৭ হাজারের কিছু উপরের টাকার সাথে সিকিউরিটির চাকুরি থেকে আর কিছু টাকা ব্যাংক-লোন নিয়ে কোনো রকম বিয়ের কার্য সম্পূর্ন করলাম। ছেলেটাকে আজ পর্যন্ত একটা এন্ডোয়েড ফোন কিনে দিতে পারি নি। সে কোনো দিনও এই নিয়ে সংকোচ বোধ করে নি। কিন্তু আমি তো বাবা! আমি তো আর দশটা ছেলের চলাফেরা দেখি। তখন খুব খারাপ লাগে জানো।
এখন যে খাবার খাচ্ছি তাও সংকোচের মাঝে খাচ্ছি।কারন খাওয়ার পরই বাড়ি থেকে আমার বৃদ্ধ মা ফোন করে জানতে চাইবে,
বাবা কি দিয়ে ভাত খেয়েছিস। তখন আমি কি করে বলবো মা আমি মুরগি/মাছ দিয়ে খাইছি। কিন্তু আমি তো জানি আমার মা/ আমার পরিবার কি খেয়ে জীবন কাটাচ্ছে!
তাদের খাবারের দিনটাই কাটে ক্ষেত-কচু কিংবা কুঁড়িয়ে আনা শাঁক দিয়ে। আর আমি এই শোক নিতে পারবো না বলে লোকটি আর চোখের পানিটুকু ধরে রাখতে পারলো না।
ওনার নিরব হাহাকারে আমরা নিঃস্তব্ধ হয়ে রইলাম। আর ওনার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম আর ভাবতে লাগলাম এই মানুষটা চাইলে আরো ভালো ভাবে থাকতে পারতো হয়তো বা স্বাধীন দেশটায় এমন পরাধীন অবস্থায় আরো অনেকেই রয়েছে নিঃসঙ্গ বিন্দুর মাঝে। যাদের বুঝার মতো সময়ও হয়তো কারোর কাছে এই ব্যাস্ত নগরীতে নেই।
এক পর্যায়ে চোখের জল মুছতে মুছতে ওনি বলতে লাগলো বিশ্বাস করো আঙ্কেল এইখানে কেউ আমাদের সম্মানের চোখে দেখে না। ছোট চাকুরি করি তো তাই হয়তো। তারপরও হয়তো আমি ভালোই আছি। কষ্ট হয় মাঝে মাঝে পরিবারকে সুখি করতে চাই কিন্তু এতো কষ্ট আর অবহেলা গ্রহন করেও পরিবারটাকে সুখি করতে পারছি না। তাদের এক মুহুর্ত্বের ফোন আমাকে অনেকটাই কাঁদায়। যাই হোক আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবা‌ আঙ্কেল।
আমাদের মুখে সেই মুহুর্ত্বের জন্য কোনো ভাষা ছিল না। একটাই কথা বলেছিলাম তখন
স্যার, আপনি আপনার জীবনের বেশীর ভাগ
সময়টা কাটিয়েছেন দেশ প্রতিরক্ষার স্বার্থে। আপনাকে এভাবে ভেঙ্গে পড়াটা মানায় না।
বলতে বলতে খাবার শেষ করে বেড়িয়ে পড়লাম আমরা। ওনার দেশের জন্য এই আত্মত্যাগের কথাটুকু স্বরন করিয়ে ওনার থেকে ঠিক তিন কদম পিছনে সরে শ্রদ্ধার সাথে দেশের সাবেক এই প্রতিরক্ষা সৈনিককে
             “স্যালুড” জানালাম।
আর বললাম স্যার আপনাকে জানাই দেশের    সর্বোচ্চ “সম্মান আর অধিকতর শ্রদ্ধা” যা আপনি সব-সময় পাওয়ার যোগ্য। আজ থেকে আমরা গেইট পাস করলে আমাদের আপনি স্যালুড করবেন না। তার পরিবর্তে আমরা আপনাকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সহিত
            দেশরক্ষা স্যালুড করবো।
“কারন আপনি হাসলেই হাসবে আমার দেশ”
         স্যালুড স্যার; স্যালুড বাংলাদেশ;