একটি আবিরের গল্প – মীর হৃদয়।

আবিররা তিন বন্ধু ছিল, আবির, ইস্তিয়াক আর সাব্বির। কিন্তু হটাৎ একদিন তিন বন্ধু থেকে দুই বন্ধুতে পরিনত হলো তারা, ইস্তিয়াক আর সাব্বির। হটাৎ করেই আবির তাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছিল। আবিরের মৃত্যুতে কারো কিছু যাওয়া আসা না থাকলেও ইস্তিয়াক আর সাব্বির তাকে খুব মিস করতো। আবিরের মৃত্যুর পরে তার জানাযার নামাজটাও পড়ানো হয় নি। একজন আত্বহত্যাকারির জানাযা পরিয়েই বা কি লাভ, সে তো এমনিতেই দোযখে যাবে। মানুষজন আবিরের মৃত্যুর পর অনেক কথাই বলেছে, যেমন ছেলেটা বেয়াদব ছিলো, বাবার কথা শুনতো নাহ, ওর আপন মা বেচে থাকতেও অনেক যন্ত্রণা দিয়েছিল ওর মাকে। এমন অনেক কথাই বলেছে এলাকার মানুষজন, অনেকেতো গাজাখোর বলেও দাবি করেছে আবিরকে। কিন্তু আবিরের কি এমন কষ্ট ছিল যে এই কষ্ট নিয়ে বেচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াটাকেই ভাল মনে করলো সে। সে কি তবে মানষিক ভাবে বিপর্যস্ত ছিল। নাকি কোনো মেয়ে সংক্রান্ত ব্যাপার। যাক মরে গেছে আর এত চিন্তা করে লাভ আছে।
আবিরের বাবা আবিরকে নিয়ে কেমন চিন্তা করতো, তার ভবিষ্যত নিয়ে কেমন চিন্তা করতো এই কথাগুলো কেউই ভাবে নাহ। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে একজন আবির না থাকলেই বা কি হয়। প্রতিবেশি হিসেবে আমি যতটুকু জানি আবির একজন ভাল মানুষ ছিল, একটু পাগল টাইপ এর ছিল, কিন্তু মন্দ ছিল নাহ। শুনেছি তার আম্মু মারা যাওয়ার পরপরই নাকি তার আব্বু আরেকটা বিয়ে করে ফেলে। আর ওইদিন এর কিছুদিন থেকেই আবির সহ আবিরের ভাই বোন সবাই মন থেকে উঠে যায় আবিরের বাবার। সর্ব প্রথম আবিরের ভাইকে পরিবার থেকে বিতারিত করা হয়। তার পর একে একে দুই বোন। ধিরে ধিরে আবিরের মায়ের সাজানো সংসার থেকে আবিরকেও দুরে করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তো আবির পা চেটেও খেতে হয়েছিল তার সৎ মায়ের। কিন্তু এতোকিছুর মাঝেও কয়েকটা মানুষ এখনো মন থেকেই ভালবাসে আবিরকে, যার মধ্যে ইস্তিয়াক, সাব্বির আর আমি সবার আগের কাতারে থাকবো৷ আমার সাথে আবিরের কোনো বন্ধুত্ব ছিল নাহ। কিন্তু সে ছিল আমার নামাজের পার্টনার। আমরা একসাথে একই মসজিদে নামাজ পরতাম। আর মাঝে মাঝে এক সাথে বিরি সিগারেট ও খেতাম। কিন্তু আমি কখনোই বুঝতে পারিনি যে আবির এমন একটা কাজ করে বসবে। সে মানুষিক ভাবে এত বিপর্যস্ত ছিলো সেটা আমি কখনো টের ই পাই নি। শুধু আমি কেন হয়তো ইস্তিয়াক আর সাব্বির ও পায়নি। আর যদি টের পেতই তাহলে হয়তো আবির নামের ছেলেটা আজ আমাদের মাঝেই থাকতো। প্রায় ২ বছর আগে একদিন আবিরের মুখে শুনেছিলাম তার নাকি একটা প্রেমিকাও ছিল। কিন্তু মারা যাওয়ার ৬ মাস আগেই মনে হয় ওই মেয়েটা আবিরকে ছেরে চলে যায়। কিন্তু আবিরের মৃত্যুর কারণ তো ওই মেয়েটা হতেই পারেনা। আর যাই হউক আবিরের মতো একটা শিক্ষিত ছেলে তো আর একটা মেয়ের জন্য জীবন দিবে নাহ। আমার কৌতুহলী মন অনেক সময় আমাকে বলে উঠে আবিরের মৃত্যুর রহস্য কী জানিস। ঠিক তখনই আমার মন টা খারাপ হয়ে যায়৷ কারন আমার সাথে চলতো একটা ছেলে, আমি তার হুট করে আত্বহত্যার কারণ টা জানিনা সেটা ভেবেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারি নাহ।
এমন কৌতুহলের বসেই একদিন আবিরের বাবাকে আমি জিজ্ঞেস করে বসি যে চাচা আবর ভাইয়ের কথা খুব মনে পররেছে। বেচে থাকলে হয়তো একসাথেই নামাজ পরতাম, একসাথেই ভলিবল খেলতাম। কিন্তু আবিরের বাবার উত্তরটা শুনে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, তিনি চেচিয়ে বলে উঠেছিলেন ওই কু** বাচ্চার কথা আমাকে বলবি না। আমি চুপ চাপ মাথা নিচু করে চলে আসি। চাচার এমন রিয়েক্ট করাটা আমি নিতে পারিনাই। তার কিছুদিন পর ইস্তিয়াক ভাইয়ের সাথে দেখা, আমাকে দেখে ভাই ভাল জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিন্তু আমি উত্তরে বলেছলাম( ভাই আবির ভাইয়ের কথা খুব মনে পরতেছে) তারপর ইস্তিয়াক ভাই সহ বাজারের দিকে গেলাম। ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করে স্মোক করো? আমি মাথা নিচু করলাম। ভাই দুইটা বেন্সন কিনে আমাকে সহ বাজারের পিছনে নিয়ে গেল। আমি খেয়াল করেছিলাম ইস্তিয়াক ভাইয়ের চোখ টলমল করতেছিলো, ভাই ২ টা সিগারেরটে আগুন জ্বালিয়ে আমার দিকে একটা বাড়িয়ে দিল। আমি নিলাম, তারপর ইস্তিয়াক ভাই বলা শুরু করলো।
(ইস্তিয়াক ভাই আর আমার কনভার্সেশন)
ইস্তিয়াক- আবির আত্বহত্যা করে নাই রে, আবিরকে মেরে ফেলা হয়েছে। বেচে থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে আমার বন্ধুটা, কিন্তু ওই বজ্জাত মহিলাটা ওরে বাচতে দেত নাই
আমি- কি বলেন ভাই?
ইস্তিয়াক- বলতো একটা মানুষ কয়বার মরে?
আমি- ক্যান একবারই তো মরে। ( আমি মনে মনে ইস্তিয়াক ভাইকে পাগল ভাবতেছিলাম)
ইস্তিয়াক- নাহ রে, মানুষ একবার মরে নাহ, আমার বন্ধুটা প্রতিদিন মারা যেতো, কতো কষ্ট যে পাইতো।
আমি- কেমন কষ্ট ভাই।
ইস্তিয়াক- সেই কষ্ট তুই বুঝবি নাহ, আমিও বুঝবো নাহ, সেই কষ্টটা শুধুমাত্র আবিরই বুঝতো।
( কথা বলতে বলতে আমার আর ভাইয়ের দুইজনের ই সিগারেরট শেষ হয়ে আসলো, ইস্তিয়াক ভাই আমাকে ৫০ টাকা দিয়ে বলে যা সিগারেট নিয়ে আয়)
ইস্তিয়াক- আমি কিন্তু আগে ধুমপান করতাম নাহ, সুব সময় আবিরকে ধুমপান করতে না করতাম।
আমি- এখন করেন কেন?
ইস্তিয়াক- করা লাগে রে, আবিরের চলে যাওয়াটা মেবে নিতে পারতেছিনা। ( বলতে বলতেই কান্না করে দিল ইস্তিয়াক ভাই)
আমি- আবির ভাইয়ের বাবা মা এখন কেমন আছে।
ইস্তিয়াক- আবির মারা যাওয়ার পর আমি আর ওদের বাড়িতে যাই নি, শুনেছি ওর সৎ ভাইটা নাকি ওর মতই হয়েছে। বড় হলে হয়তো ওর কথা মনেও থাকবেনা।
আমি- হুম।
ইস্তিয়াক- এখন যাই রে, কাজ আছে ভাইয়ের।
( এই বলে আমাদের কনভার্সেশন শেষ হলো।
আমি মাঝে মাঝেই ভাবি আবির ভাইয়ের কথা, আবির ভাইয়ের যায়গায় নিজেকে রেখে ভাবার চেষ্টা করি যে আত্বহত্যা মহাপাপ জেনেও কেন এ কাজটা করতে গেলেন ভাই। আল্লাহ যেখানেই রাখুক আবির ভাইকে ভাল রাখুক। অন্তত প্রতিদিন মরার চেয়ে একবারে মরে যাওয়াটাই হয়তো ভাল মনে করেছিলেন আবির ভাই।
বিঃদ্র: গল্পে কেউ বাস্তবতা খোজার চেষ্টা করবেন নাহ, গল্পটি একান্তই কাল্পনিক। একজন ব্লগার হিসেবে মাঝে মাঝেই আমার একটু গন্ডির বাহিরে চিন্তা করতে ভাললাগে। আর এই চিন্তার ফলেই বেরিয়ে আসে কিছু ভাল গল্প, আর কিছু ফ্লপ গল্প। এই গল্পটাও ফ্লপ নাকি ভাল আমি জানিনা। কিন্তু এত সময় ধরে ধৈর্য ধরে গল্পটা পরার জন্য সকলকেই আন্তরিক ভাবে ধন্যবাদ জানাই।