রিভেঞ্জ অফ নেচার- সামিউল আদনান।

ভাইয়ার সাত বছরের রিলেশন ছিলো মেয়েটার সাথে। মেয়েটা আমাদের ডিপার্টমেন্টেই পড়তো। নাম ফারিয়া।
.
ভাইয়ের নাম ছিলো রাফসান। আমাদের হলেই থাকতেন। তিন ব্যাচ সিনিয়র। কোনদিনও হাসি ছাড়া দেখিনি উনাকে। এতো ভদ্র ছেলে পুরো ক্যাম্পাসে পাওয়া দুষ্কর ছিল। মেয়েটাকে ভালোবাসতেন পাগলের মতো। প্রায়ই দেখা যেতো ক্যাম্পাসে হাতে হাত রেখে হেটে চলেছেন দুজনে। আমাদের চোখে চোখ পড়তেই অবশ্য হাত ছেড়ে দিয়ে লাজুক হাসি দিতেন রাফসান ভাই। মাঝে মাঝেই রাতের তিন-চারটায় ঘুম ভেঙে গেলে উঠে দেখতাম, হলের করিডোরের এক কোনায় দাড়িয়ে ভাই তখনও গুজুর গুজুর করেই চলেছেন।
.
একটা চাকরির অভাবে সেই সম্পর্কটাই বদলে গেল ভীষনভাবে।
ততোদিনে ভাইয়ের মাস্টার্স পাস করা শেষ। চাকরি পাচ্ছেন না বলে হলে থেকে গিয়েছিলেন আরও দেড় বছরের মতো। ফারিয়া রাফসান ভাইকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো ফারিয়ার মাস্টার্স শেষের এক বছরের মাথায়। যাবে নাই বা কেনো সুন্দরী মেয়ে, বাসায় বিয়ের প্রস্তাব এসেছে, সেই ছেলে আবার প্রসাশনের বড় কর্মকর্তা।
যাওয়ার আগে ফারিয়া বলে গিয়েছিলো, “চাকরি পাও না যোগ্যতা নেই, তো প্রেম করতে এসেছিলে কেন?”
.
ব্রেকাপের পর ভাই প্রায়ই আমার রুমে আসতেন সিগারেট খেতে। হাতে সবসময় কোনো না কোনো বিসিএসের বই থাকতোই। ঘন্টার পর ঘন্টা ধোঁয়া ছাড়তেন আর মাঝে মাঝে উনার জীবনের গল্প বলে চলতেন। বাড়ির রান্নাঘরের কোনাটা ভেঙে পড়েছে, বড় বোনটার বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে, বাবা আবার পেনশনে গেছে এই বছর। মাঝে মাঝে কথা বলা বন্ধ করে সিলিং ফ্যানের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। কি যেন ভাবতেন। হয়তো সে ভাবনা আমাদের ধরাছোয়ার বাইরে।
.
মাস্টার্সের দেড় বছরের মাথায় রাফসান ভাইকে হল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো। বের করে দিয়েছিলো তারাই, যারা ভাইয়ের হেল্প পেতে পেতে এতদূর এসেছে, যাদেরকে হলে ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন রাফসান ভাই নিজেই।
.
যেদিন ভাই বেরিয়ে যান অঝোর ধারায় চোখ থেকে পানি পড়ছিলো। ভার্সিটিতে ক্লাস সেরে এসে দেখি, ভাই বের হয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমাকে দেখে চোখে পানি নিয়ে অনেক কষ্টে একটা হাসি দিয়ে বলেছিলেন, “আর যাই করিস, প্রেম করতে যাস না ভাই। জীবনটা ছাই বানিয়ে দেবে।” কথাটা কাগজে লিখে দেয়ালে টানিয়ে রেখেছিলাম।
উপরের কথাগুলো প্রায় বছর-দশক আগের।
ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত একটা কাজে বহুদিন ধরে চেষ্টা করছিলাম কোনো এক কাষ্টমস অফিসারের সাথে যোগাযোগ করতে, বিষেশত ভার্সিটির কোনো বড় ভাইয়ের সাথে। হেল্প বেশি পাওয়া যায় তাহলে। খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারলাম রাফসান ভাই। ভাই এখন ঢাকা এয়ারপোর্টের নামীদামী কাষ্টমস অফিসার।।
.
সময় করে একদিন গেলাম ভাইয়ের অফিসে। যা চকচকে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের একপাশে বসে ছিলেন ভাই, আমাকে দেখে বিশাল এক হাসি দিয়ে এগিয়ে এসে বুকে বুক মেলালেন। একথা সেকথার পর উঠল সংসার জীবনের কথা, আমি বললাম বিয়েটা করিনি এখনো, বহমান জীবনই ভালো লাগছে। ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে বললেন, বিয়ে করেছেন, একটা ফুটফুটে বাচ্চাও হয়েছে। ভাবী আবার সলিমুল্লাহ মেডিকেলের ডাক্তার।
.
অনেকক্ষন যাবত মনের মধ্যে একটা কথা বাজছিল, শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, “ফারিয়ার কথা মনে পড়েনা, ভাই?” বেশ বড়সড় একটা হাসি দিয়ে বললেন, না রে। জীবনে যা চেয়েছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়ে গিয়েছি। এখন আর এইসব ছোটখাট চাওয়াগুলো পাত্তা পায়না।
জিজ্ঞেস করলাম, “ফারিয়ার আর কোনো খবর পাননি?” কিছুক্ষন চুপ থেকে বললেন, “শুনেছিলাম বছরখানেক আগে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। এরপর আর কোনো খবর পাইনি।”
.
ভাইয়ার গাড়িতে করে একসাথে ফেরার পথে ভাইয়ার বলা একটা কথা প্রায়ই কানে বাজে “লাইফে কাউকে ঠকাস না রে। লাইফ কাউকে ছাড় দেয়না, প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়ে। রিভেঞ্জ অফ নেচার।”
.
সত্যিই, লাইফ কি ভীষনভাবে রং পাল্টায়!

কমেন্ট করুন