রাজনৈতিক প্রতিহিংসা- মীর সজিব।

পরিবারের ছোট ছেলেটি আজ গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হবে। বাবা ও বড় ভাইয়ের হাত ধরে গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে স্কুলের দিকে যাচ্ছে। মনে মনে খুশি আবার ভয় ও পাচ্ছে। অত:পর স্কুলে পৌছালো।
স্কুলে তার সম-বয়সী আরো অনেক আছে কিন্তু কেউ তার পরিচিত না। কিছুক্ষণ পরেই স্যার তাকে নাম জিঙ্গেস করলো। ভিতু মনে নাম বলিলো। আরো অনেক প্রশ্ন করলো, ছেলেটি ভিতু মনে উত্তর দিলো। স্যার খাতায় কি যেন লেখলো। তারপর তাকে একটি শ্রেণীকক্ষে নিয়ে আসা হল। সেখানে অনেক ছেলে-মেয়ে বসে আছে। ছোট ছেলেটিও তাদের পাশে বসলো। কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। সবাই গম্ভীরভাবে বসে আছে। হঠাৎ দু’জন মানুষ শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করলো। একজন বললেন সবাই দাড়িয়ে সালাম জানাও উনি তোমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সবাই দাড়িয়ে সালাম জানালো সাথে ছোট ছেলেটিও। তারপর প্রধান শিক্ষক সবাইকে বসতে বলে নিজেও একটি চেয়ারে বসে গেলেন।
স্যার একে একে সবার নাম ও পরিচয় জিঙ্গাসা করলেন। ছোট ছেলেটিও ভিতু মনে সব বলিলো। সবার পরিচয় শেষে স্যার বলিলো আজকে তোমাদের নতুন বই-খাতা ও তোমাদের রোল (হাজিরা নং) জানিয়ে দেওয়া হবে। গ্রামের স্কুলে তেমন নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয় না। এক এক করে সবাইকে নতুন বই-খাতা দেওয়া হলো। ছোট ছেলেটি নতুন বই-খাতা পেয়ে তেমন খুশি হতে পারলো না কারণ তার রোল ছিলো ৫২। তারপরেও খারাপ লাগাটা বেশীক্ষণ স্থায়ী হলোনা নতুন বইয়ের আনন্দে। শ্রেণীকক্ষ থেকে বেড়িয়ে ছোট ছেলেটি বাবা ও ভাইয়ের সাথে সেই চেনা পথ দিয়ে বাড়ী আসলো।

বাড়ীতে এসে তার মাকে নতুন বইগুলো খুশী মনে দেখাচ্ছে। দিন দিন নতুন বইয়ের গন্ধ তাকে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে ফেললো। পরদিন সে একাই তার চিরচেনা রাস্তা দিয়ে হাতে বই নিয়ে স্কুলে চলে আসলো। প্রথমদিন যেই ক্লাসরুমে বসে ছিলো আজ একই ক্লাসরুমের দিকে চলে আসলো। ক্লাসরুমে প্রবেশ করেই প্রথম দিনের ছেলে-মেয়ে গুলিকে দেখতে পেলো এবং তাদের পাশেই একটি বেঞে বসল। প্রথম দিনের মতই একজন স্যার ক্লাসরুমে একটি খাতা নিয়ে প্রবেশ করলো। সবাই দাড়িয়ে স্যারকে সম্মান জানালো সাথে ছোট ছেলেটিও সবার দেখাদেখি দাড়ালো। স্যার নিজের চেয়ারে বসে সবার নাম ও রোল ডাকলেন। রোল ডাকা শেষ করে স্যার সবাইকে তাদের নতুন বই খুলতে বললেন। সবার দেখাদেখি ছোট ছেলেটিও তার নতুন বই খুললো।

স্যার নতুন বই থেকে কিছুক্ষণ পড়িয়ে চলে গেলেন। এভাবেই ছোট ছেলেটি নিয়মিত ক্লাস করতে থাকলো। দেখতে দেখতে একটি বছর চলে গেলো ছোট ছেলেটিও দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলো। দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ছেলেটির রোল হলো ৩। ছোট ছেলেটিও খুশি ছেলেটির পরিবারের সবাই খুশী। নিয়মিত সে ক্লাস শুরু করলো, সবার সাথে পরিচিত হয়ে গেলো। সবাই একে অপরের বন্ধুর মতো। হঠাৎ একদিন স্কুলে প্রায় সবাইকে টাকা দিচ্ছে। গ্রামের স্কুলে গরীব শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেওয়া হয়। তার কয়েকজন সহপাঠীর মা স্কুলে এসে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ছোট ছেলেটিকে টাকা দেওয়া হচ্ছে না। তখন ছোট ছেলেটিকে টাকা দেওয়া হচ্ছে না। তখনই ছোট ছেলেটিও কানড়বা করতে করতে বাড়ী চলে আসলো তার মা’কে সব বললো , তার মা হাসিমাখা মুখ করে বললো বাবা এ টাকা তোমার জন্য না। ছেলেটি তারপরেও কানড়বা করছিলো। এভাবে কিছুক্ষণ কানড়বা করার পর সব ঠিক আগের মতো হয়ে গেলো। ছোট ছেলেটিও প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত শুরু করলো। দেখতে দেখতে আরো একটি বছর চলে গেলো। ছেলেটিও তৃতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলো। স্কুলের সব জায়গা তার কাছে অতি পরিচিত হয়ে উঠলো। প্রতিদিনের মতো স্কুলে আসা-যাওয়া শুরু হলো। তেমনিভাবে আরো একটি বছর শেষ হয়ে গেলো। সেও চতুর্থ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলো। রোল তার আগের মতো তিন ই থাকলো। এখন তার কাছে যেন বছরগুলো খুব ছোট হয়ে গেলো।
দেখতে দেখতে এ বছরটাও শেষ হয়ে আসলো। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। পরীক্ষার ফলাফল আসলো, ছোট ছেলেটি দ্বিতীয় হলো ,ছেলেটিও অনেক আনন্দিত। ছেলেটি কখনও প্রথম হতে পারেনি। তার মূল কারণ গ্রামের সকল প্রাথমিক স্কুল এর শিক্ষকদের সন্তানই প্রথম থাকে।
পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তার উপর যেন পড়ার চাপ আরো বেড়ে গেলো। স্কুলের সকল স্যার ও বাড়ীর সবার একটাই আশা ছোট ছেলেটি যেন বৃত্তি পায়। ছেলেটিও বৃত্তি পাবার আশায় ভালো মতো পড়াশুনা করতে থাকে। স্কুলে কোচিং করানো হয় সকাল ৯ টা থেকে ১১.৩০ । আর ক্লাস শুরু হয় ১২.৩০ থেকে। ছেলেটিও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে কোচিংÑক্লাস করার জন্য গ্রামের আকা-বাঁকা পথদরে স্কুলের দিকে চলতে থাকে। প্রতিদিনের মতোই সে তার নিয়ম অনুযায়ী কোচিং-ক্লাস করতে থাকে। দেখতে দেখতে স্কুলের মডেল টেষ্ট পরীক্ষা চলে আসে, পরীক্ষায় সে ছেলেটি প্রথম হয়। স্যারদের মনোবল আরো শক্ত হয়, এই ছেলেটিই স্কুলের মুখ উজ্জল করবে। বৃত্তি পরীক্ষার সময় ও এসে গেলো। তবে তার বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালো ছিল। নিজ উপজেলায় বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে আসলো। এদিকে তার সমাপনী পরীক্ষাও শেষ। ছেলেটি এখন পুরোপুরি স্বাধীন। পড়ালেখার জন্য এখন কেউ কছিু বলে না।
এভাবেই কয়েকদিন যওয়ার পর, স্কুলের এক স্যার তার বাড়ীতে মিষ্টি নিয়ে হাজির। বাড়ীর লোকজন স্যারের হাতে মিষ্টি দেখে অবাক। স্যার এসেই বাড়ীর ছোট ছেলেটির খুজ করতে লাগলেন। কেউ কোন কথা বলছে না। সবাই নিরব। তখন কানড়বা জড়িত ছোট ছেলেটির মা স্যারকে বাড়ীর পাশে একটি কবরের কাছে নিয়ে যায়। বলতে থাকে এই যে আমার মানিক সোনা, এখানেই আরামে ঘুমাচ্ছে। আমার মানিক সোনা আমায় আর মা বলে ডাকে না। সে আর বলে না মা আমাকে স্কুল থেকে কেন টাকা দেয় না। অবশেষে স্যার জানতে পারলেন, রাজ‣নতিক প্রতিহিংসার শিকার বাড়ীর ছোট ছেলেটি। বাবার সাথে শহরে চাচার বাসায় বেড়াতে যওয়ার সময় রাস্তায় পেট্রোল-বোমা হামলায় ঝলসে যায় বাড়ীর ছোট ছেলেটি।
এই হলো আমাদের রাজনীতি। আর কত এই ছোট ছেলেটির মতো প্রাণ চায় আমাদের এই নষ্ট রাজনীতি???

কমেন্ট করুন