প্রয়াত শ্রী স্বর্নকমল ভৌমিক(দাদুভাইয়ের) দেহ ত্যাগ -শুভ্র ভৌমিক জয়।

48989541_915207268683193_6784518322890211328_n
আজ ২৮শে ডিসেম্বর
সাল ২০১৮
নিজেদের দিনে সবাই সেরা।কিন্তু আমি লেখক আজ নিজেকে নিয়ে তেমন কিছুই বলতে বা লিখতে বসি নি। পরিবারের সর্বশেষ এক পরলোক গমনকারী সদস্যকে নিয়ে লিখতে বসছি। সে আর কেউ নন বরং তিনি হলেন মা-বাবা এবং শিক্ষকের পর আমার একমাত্র অনুপ্রেরণার স্থান প্রিয় ও ভালোবাসার প্রয়াত স্বর্নকমল ভৌমিক (দাদুভাই)।
আমার জানা মতে, ওনার জীবনের পুরোটাই কোনো না কোনো কর্মের মধ্যদিয়ে কেটেছে। ওনার মাঝে নিন্তান্তই নতুন নতুন প্রতিভার জন্ম হয়েছে।তার মাঝে ছিল সততা ও অপরের জন্য অশেষ ভালোবাসা।পরিবারকে ভালোবাসতেন বলে কখনওই কোনো সমস্যায় নিজেকে জড়াতেন না।কারন তিনি সদা একটা কথাই ভাবতেন তার পরিবর্তে এই সুন্দর পরিবারটাকে কে দেখবে!
কর্মমুখী জীবন থেকে যখন তিনি একবারের জন্য ঘরে বসে যান তার আগে তিনি নিজের ও পরিবারের সর্বপরি জনসাধারণের সেবায় নিয়োজিত হাওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রকার কাজ শিখে নিয়েছেন।যেমন,‌ক্রিকেট ব্যাট তৈরী, লাঠিম তৈরী, ভগবান শ্রী কৃষ্ণকে স্বরনে রাখার জন্য তুলসী মালা তৈরীসহ আরো অনেক কিছু।কিন্তু তার এই সুন্দর প্রতিভাকে গ্রহন করার সামর্থ অনেকেরই হয়ে উঠে নি।যাই হোক তারপরও বলবো অনেকের মাঝে অনেক প্রতিভাই লুকিয়ে থাকে কিন্তু তা বুঝে নেওয়ার অন্তিম শক্তি সবার মাঝে থাকে না।আমি লেখক একটা কথা সর্বদাই বিশ্বাস করি যে, প্রতিটি মানুষের স্বাধীন ভাবে তার মতামত প্রকাশের সর্বোওম অধিকার রাখে।
পরে প্রতিটি ব্যাক্তি তার কর্ম অনুসারে কর্মফল পাবে।
তার অনেকগুলো প্রতিভার মাঝে একটি হলো,তিনি তার সংস্পর্শে থাকা প্রতিটি মানুষকে আত্ম-শক্তি ও অনুপ্রেরণা দিতেন।
তার দেওয়া এই আত্ম-শক্তি ও অনুপ্রেরণা গুলোকে নিজের করে নিতে হলে আগে সেই গভীর চিন্তাচেতনার মধ্যদিয়ে নিজেকে নিতে হবে।তবে আমি লেখক এই ব্যাক্তির জ্ঞানের তুলনায় তুচ্ছ একজন। সেই দিক থেকে বলতে গেলে ওনাকে নিয়ে লেখার কোনো যোগ্যতাই আমার নেই।তারপরও এমন একটি মানুষের চিন্তা-চেতনাকে সকলের মাঝে জানান দেওয়ার প্রয়োজন  আবশ্যক। নিজের দেহ-ত্যাগের আগে এবং মস্তিষ্ক নিজের নিয়ন্ত্রনে থাকা পর্যন্ত তিনি মানুষের ভালো কাজে ও দেশের একজন মানব সম্পদ হয়ে আমাদের মাঝে ছিলেন।
পরিবার ও পরিবারের বাহিরের প্রতিটি সদস্যকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় ও কাছের ধর্ম গ্রন্থ শ্রীমতভাগবত গীতা সম্পর্কে ধারনা প্রদানের চেষ্টায় ছিলেন।প্রতিটি সদস্যকে গীতা সম্পর্কে সনাতন ধর্ম ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে ধারনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।কৃষ্ণনাম নেওয়ার সহজ করার জন্য তুলসীমালা তৈরী করে  তা সকলের মাঝে পৌঁছে দিতেন আর নিজেও ব্যবহার করতেন।এক কালে সময় করে ভারতে অবস্থিত সনাতন ধর্মের তীর্থস্থান দর্শন করে এসেছেন।সেখানে‌ থেকে আসার আগে‌ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য এসেছেন তাদের কর্মজীবনের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র। সেইখান থেকে ফিরে এসে সেখানে দেখা প্রায় সকল কিছুই সবার সামনে তুলে ধরেছেন।
নিজের জীবনকে ধর্ম পথে হাঁঠিয়েছেন ঠিকই কিন্তু কিছু কিছু ভুল সিন্ধান্তও নিয়েছেন চলার পথে। যা আজ সবার কাছে এক মহাপাপ বলেও শোনা যায়। নিজ অর্ধাঙ্গীনিকে নিয়ে সনাতন ধর্মের মহাপুরুষ শ্রীরাম ঠাকুরের শিষ্যর্ত্ব গ্রহন করেন।কিন্তু পরে নিজের শিষ্যর্ত্বকে ভুলে গিয়ে ভগবান শ্রী কৃষ্ণের একানিষ্ঠ ভক্ত হওয়ার চেষ্টায় তিনি (ইসকন) এ যোগদান করেন। ফলে সেখানে তার নতুন এক গুরুর নাম উঠে আসে।যার জন্য পরিবারের কাছে তিনি আজও সমালোচিত।
দেহ-ত্যাগ নিয়ে আর্কষনীয় তেমন কিছুই হয় নি। দেহ-ত্যাগের বেশ অনেকদিন আগে থেকেই তিনি তার চেতনাকে হারিয়ে বসেছিলেন। ফলে যে মানুষটি নিতান্তই ধর্ম নিয়ে আলোচনায় থাকতেন এবং নিষ্ঠার সাথে ধর্ম পালনের চেষ্টায় থাকতেন সে তিনিই ধর্মচর্চাহীন জীবন-যাপনসহ নানান কার্য করতে থাকেন। এই বিষয়গুলো তখন কারো কাছে বোধগম্ম না হলেও আজ তার মৃত্যুর ১৮ দিন পর তা বুঝতে পারছি।
কিন্তু ততদিনে তার এই কর্মকে কেউই ভালোভাবে নিতে পারে নি।শেষ সময়ে আর মৃত্যুর আগে এই কষ্টের কারনও নাকি এই গুরু অবমাননা থেকেই হয়েছে। কথাগুলো শুনে নিজেকে একটি বারের মতো চুপ করে রাখতে পারি নি।
ওনার মৃত্যুর ঠিক কয়েকদিন আগে থেকেই  দেখতে পেলাম কোনো এক আলোকিক শক্তি ঘুমন্ত আমাকে আহ্বান করছে “সকল কর্মের ফলদাতা আর প্রতিটি কর্মের দন্ডনায়ক ” ‘শনিদেব’ সম্পর্কে জানতে।
তাই কাউকে না জানিয়ে কৌতুহলি হয়ে শনিদেব সম্পর্কে জানতে শুরু করলাম আজ তার মৃত্যুর ১৮ দিন পর আমি শনিদেব সম্পর্কে কিছু সাধারণ জ্ঞান লাভ করলাম।তাই আজ সেই মানুষ গুলো উদ্দেশ্যে বলতে চাই যারা অন্যের কর্ম নিয়ে সমলোচনায় মেতে ছিলেন। আজ আপনাদের জন্য এটাই বলবো যে, কর্ম আর কর্মফলের হিসেব তো মহাদেবের সৃষ্ট সেই কর্মফল দাতাই নিবেন যিনি সকলকে তার কর্মফল দিয়ে থাকেন ” শ্রী শনিদেব” ।
মৃত্যুর ঠিক একমাস আগেই হঠ্যৎ স্টোক করে বসেন এর ২-৩দিনের মধ্যেই‌ হার্ট এ্যাটার্ক। পরিবারে সামর্থ আর সিন্ধান্তহীনতায় তাকে ৩-৪ স্থানে ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখান থেকে ঔষধপত্র নিয়ে বাবা-কাকা ও লেখকের নিয়মিত ছুটে চলা। একটা সময় পরিবারের কোনো এক সদস্যের সিন্ধান্তে বাসায় নিয়ে আসা হয়। সেই ব্যাক্তির নাম উল্লেখ করে আর পরিবারকে ছোট করতে চাই না। বাসায় তাকে নিয়মিত সেবা প্রদানের জন্য বেশীর ভাগ সময় বড় বোন কখনও বা অল্প কিছু সময়ের জন্য কাকা আর লেখক নিয়ে নিয়জিত ছিলাম। মা ও কাকিদের কর্ম জীবনের অর্ধসমাপ্তি করে প্রিয় দাদুর জন্য আর্থিক ও শারীরিক সেবা করা , বড় কাকা নিজের দূরত্বকে ছোট করে দেখে নিজের বাবার শারীরিক অবস্থায় নজর দেওয়া সবই ছিল এই অবধারীত মৃত্যুখেলায়।
১০শে ডিসেম্বর,
দেহ-ত্যাগের দিনটির কথা, সকাল থেকেই ওনার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। কোনো ভাবেই খাবার বা ঔষধ খাওয়ানো যাচ্ছিলো না।একেবারেই অন্যরকম, দাঁতগুলো বের হয়ে শক্ত আকার ধারন করেছে।ঔষধগুলো মুখে তুলে দেওয়ার পর তা আবার সেইখানে ফিরে পাওয়া।সবই ছিল অন্য সবদিনগুলো থেকে ভিন্ন।পরিবারের প্রায় সবাই বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন যে হয় তো সময়খানি ফুরিয়া এসেছে ওনার। এমন করেই সারাটাদিন কাটলো। রাত তখন ১১টা বেজে কিছু সময় । মোটামুটি সবাই ওনার পাশে বসা।ওনাকে দেখতে দেখতে আর খাওয়ানোর চেষ্টায় কেটে গেলো আরো প্রায় ১ ঘন্টা। সেখানে থাকা আমার মা, ছোট আন্টি,বড় বোন, ছোট ভাইগুলো সহ সবাই কাকার মধ্যরাতের আহৃবানে ঘুমাতে যায়।
তখন প্রায় ১টা বাজতে যাচ্ছে। সবাই ঘুম ঘুম চোখে বিছানায় চলে আসে আর ঘুমিয়ে পরে। এটাই ছিলো পরিবারের শেষ দেখা।কাকা মধ্যরাতে ওঠে একবার দেখে যায়।
তখনও শ্বাস কার্য চলছে তার।
পরের দিন সকাল না হতেই মামার বাড়িতে অবসথান করা আমি কল-কাকলির আওয়াজ শোনার আগেই পাশের বাসার এক মামি আমায় সংবাদ দেয়, আমার মা ওনাকে ফোন করে জানিয়েছেন যে,
“ভালোবাসার ও প্রিয়দের আসনে
থাকা দাদুভাই আর নেই”
মুহুর্ত্বের মধ্যেই শিহরিত হয়ে উঠলাম। হুম সত্যিটাই শুনতে পেলাম।দাদুভাই আর নেই।
তখন মনে হলো যে, নিজের মধ্য থেকে যেন কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছি। অনেকটা সময় ধরে নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলাম। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না।পরে স্থির করলাম শ্বাস-ত্যাগের আগে তো তাকে শেষ বারের মতো দেখতে পারলাম না। তাই এখন হলেও শেষবারের মতো তাকে‌ আমার দেখতে হবে। নিশ্চুপ ও নির্বাক হয়েই সিন্ধান্ত নিলাম ” কুমিল্লায় ফিরতে হবে”।
পৃথিবীতে কেউই চিরস্থায়ী নয়। এটাই ছিলো আমার একমাত্র শক্তি। কুমিল্লায় ফিরে নিজের আত্ম-চেষ্টায় দেখলাম নিবিড় আর নিরবচিত্তে শুয়ে আছে সেই প্রতিভা ও চেতনাদায়ক আত্মার দেহটি।
তাকে নিয়ে দেহ-ত্যাগের সকল কাজ শুরু হয়ে গেলো।তার আগে মা, পূজাদি সহ আমি তার কর্নের সামনে গীতা পাঠ করলাম।পরে সকলের প্রচেষ্টায় তার দেহের শেষকার্য সমাপ্ত হলো। আর বিদায় বলে দিলাম প্রিয় মানুষটিকে।
ওপারে ভালো থাকবেন প্রিয়।
ঠিক তখন থেকেই শিখলাম, “কাউকে প্রিয় করে নিয়ে তার প্রতি আসক্ত হওয়াটা উচিৎ নয়” ।।

কমেন্ট করুন