তারাই স্বশিক্ষিত -শুভ্র ভৌমিক জয়।

শিক্ষাকে অন্যেরা যেভাবে গ্রহণ করে আমি তেমন ভাবে গ্রহণ করি না।কারন,আমি মনে করি যে আমাদের প্রতিটি ব্যাক্তির জীবনে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলাে প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ নিজ অভিজ্ঞতা আর অাত্ম-শ্রমের দ্বারা সুশিক্ষিত হবে।যখন কোনো ব্যাক্তি তার নিজ কর্মের দ্বারা সুশিক্ষিত হবে তখনই সে আত্মশিক্ষা লাভ করবে।কারন, সুশিক্ষিত মানেই স্বশিক্ষিত।
ব্যাক্তি জীবনে প্রতিটি মানুষ তার কর্মকে যে দিকে চালনা করে তা সেই দিকেই ধাবিত হয়ে যায়।শিক্ষাকে অন্যেরা অর্থনৈতিক অভাবের কারনে চাহিদা আর পেশা হিসেবে গ্রহণ করে।আমি এটাকে একদমই মেনে নিতে পারি নি।হ্যাঁ,জীবনের জন্য কিংবা পেশাগত কারনে হলেও অর্থের প্রয়োজন আছে তাই বলে জাতির উদীয়মান সন্তানদেরকে আলো পথে জাগ্রত করার জন্য যখন কোনো প্রকার শিক্ষা প্রদান করতে হয় তখন তা অর্থনৈতিক ভাবকে প্রকাশ করবে না বা করতে দেওয়াটা শিক্ষাকে সঠিক মূল্যয়ন না করার সমানুপাতিকও বটে।
কিন্তু আমরা কেউ কি এটা ভেবে দেখেছি যে আমরা এই সমাজ দেখানাে উচ্চশিক্ষা লাভ করে কে কতটুকু সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অধিক সম্মানের পাত্র হয়েছি।যদি এমনই হয় তবে‌ আমি সেই সমাজকেও মূল্যায়ন করি না যে সমাজ লোক-শিক্ষার সঠিক ব্যবহার করতে জানে না। আমরা এই পুথিগত শিক্ষা অর্জন করে আর্থিক অভাব মেটাচ্ছি ঠিকই কিন্তু আমরা কেউই নিজেদের অধিক সংখ্যাক জ্ঞান অরোহনের জন্য এই উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে চাই নি বা করি নি।
যদি শুধু সমাজে সম্মানের পাত্র হয়ে থাকার জন্য এই শিক্ষা! তাহলে আমি লেখক এই শিক্ষাকে শিক্ষা হিসেবে সকলের নিকট তুলে ধরি না আর স্বশিক্ষিত হওয়ার জন্য এমন শিক্ষার প্রয়োজন থাকতে পারে তা আমি অন্তত মনে করি না। আজ যে লোক-শিক্ষা আমরা আমাদের চারপাশের মানুষ ও পরিবেশ থেকে গ্রহন করছি সেই শিক্ষার জন্য মানুষ বিবেক-চেতনা বোধকে কখনওই হারিয়ে ফেলতো না।বরং সেই আত্ম-শিক্ষাই দেশ ও জাতির গৌরবের জন্য সব সময়ই প্রস্তুত করতো। আমরা ছােটবেলা থেকে বড়দের থেকে একটা কথা শুনে এসেছি যে, জীবনে ভালো কিছু করার জন্য শিক্ষা অতি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আমি বলবো তাদের এই উক্তিটি সর্বক্ষেত্রে সত্য নয়।কারন, শুধু মাত্র শিক্ষা একজন ব্যাক্তিকে তার ভালো কাজের প্রতি এবং উচ্চ কোনো পর্যায়ে নিজেকে তোলে ধরতে আকৃষ্ট করতে পারে না বরং আত্ম-শিক্ষাই পারে সেই সব মানুষগুলোকে উচ্চ ভাবনা ও সঠিক চিন্তায় নিজেদের নিয়ে যেতে।আর সেই আত্ম-শিক্ষাই আজ অনেকাংশে বিলুপ্ত প্রায়।তাই আজ কেউ আর সুশিক্ষিত হয়ে উঠে না। আমাদের মা-বাবারা আমাদের জন্য ভালো কিছু চায় ঠিকই কিন্তু সমাজে প্রচলিত প্রথা থেকেও বের হয়ে আসতে পারে না।তারা পারে না তাদের সন্তানদের নিজ অনুরাগে সুশিক্ষা দিতে।তারা পারে না তাদের নিজ সন্তানের চোখকে দেশ ও জাতির দিকে ধাবিত করতে আর তাই আজ আমরা সন্তানেরা আমাদের মা-বাবাদের চাহিদা অনুসারে চলতে শুরু করি। আমরা তাদের কথা শুনে বুঝতে পারি যে, আমরা যদি মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এ A+ পেতে পারি তাহলে আমরা আমাদের জীবন গঠনে আরো একধাপ এগিয়ে যাবো আর কোনাে প্রকার বাধা থাকবে না জীবনের মাঝে সফলতা খুজঁতে।পরে আস্তে আস্তে আমরা একটা ভালাে মানের চাকুরি পাবাে এবং আমরা আমাদের জীবনটাকে সুন্দর ভাবে গড়তে পারবাে।
সমাজে আমাদের সম্মান থাকবে উচ্চতর মাঝে। তবে আমরা কি ভেবে দেখেছি,এই শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্য হলাে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা লাভ নয় বরং সমাজের সবার কাছে সম্মানের পাত্র হয়ে থাকা, আর অর্থ আয় করা। আমি অন্যদের সাথে এক মত হতে পারি না এই কারনে যে,আমরা ছােট ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ রাস্তাটা ঠিক করে দেখাতে পারি না। আমরা তাদের কাছে থেকে চাই A+ আর নয়তাে GPA 5 কিন্তু এতে তার বাস্তব শিক্ষাটা কেমন অর্জন হলাে তা আমরা দেখিনা। আর অন্যদিকে ছেলে-মেয়েরা তাদের মা-বাবা,বড়দের কথা মতাে পাঠ্যবইটাকে হাতে নিয়ে এর মধ্যে থাকা বিভিন্ন ধরনের প্রবন্ধ/অনুচ্ছেদ মুখস্থ অনুসরন করতে শুরু করে। ফলে বছর শেষে যখন ছেলে-মেয়েরা A+ নিয়ে বাড়ি ফিরে তখন বাবা-মায়েরা তাদের বলে এইতাে আমার ছেলেটা পড়ালেখার প্রতি বেশ মনােযােগী হতে শুরু করেছে। তারপর মুখস্থ বিদ্যায় প্রথম হওয়া সনদপত্রটাকে আলমারিতে রেখে ছেলেকে নাদুস-নুদুস খাবার দিয়ে বলে, “খাও বাবা খাও”। আর এই সনদপত্র পরে থাকে সে চাকুরি খুজতে গিয়ে এমন সব বড় বড় সনদের প্রয়োজন পরে। আমরা দেখতে পাই আমাদের সামনে এই রকম হাজারাে মা-বাবা তাদের সন্তানকে সকাল ৬ টায় ঘুম থেকে উঠিয়ে দেয় এবং তাকে গাইড বা নােট ব্যাগ দিয়ে প্রাইভেটে পাঠিয়ে দেয়।
প্রাইভেট মাস্টারকে প্রতি মাসে হাজার টাকা করে দেয় ফলে প্রাইভেট মাস্টার তাদের সন্তানদের A+ উপহার হিসেবে দেয়। এমন সব ব্যাপারগুলো ভাবতে ভাবতে মনে পরে গেল “প্রমথ চৌধুরির” লেখা “বই পড়া” প্রবন্ধটির কথা। তিনি তার প্রবন্ধ বলেছেন, আমাদের সমাজের মায়েরা সন্তানকে দুধ খাওয়ার কথা বললে সন্তান যদি দুধ খেতে নাখােঁজ করতো তাহলে সেই মা সন্তানকে স্নেহকরা শর্তেও তাকে বিভিন্ন কৌশলে বলতে শুরু করতো,আমার “মাথা খাও,মরা মুখ দেখ”এই উক্তিতে মায়ের উদ্দেশ্য যেমন সাধু তেমনী আমাদের মা-বাবাদের পড়ালেখার ব্যাপারে জোরপূর্বক কার্যক্রমগুলোও তেমনি সাধু।কিন্তু এই ভাবুক সাধু কার্যক্রমগুলো তাে সন্তানকে ভালো কিছুই দিলাে না। দিলাে শুধু অর্থ আয়ের পদ্ধতি আর শিক্ষার আসল গুন বা উদ্দেশ্যও তো তারা জানলো না। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলাে শিক্ষাকে গ্রহণ করে পাঠ্যবইগুলো পড়ে উচ্চশিক্ষায় পাশ করা না।
যেমনটা কখনও কোনো শিক্ষাক্রমের মূল উদ্দেশ্য হতে পারে না।কারণ নোট-গাইড আর পাঠ্যবই বারাে মাস পরে পরীক্ষায় গিয়ে তা তোলে দিয়ে আসার পর পাশ করার নাম শিক্ষা অর্জন নয়। সব মানুষ শিক্ষিত হতে পারে না কিন্তু পড়ালেখা সবাই করে। তার কারন যারা স্বশিক্ষিত তারা জীবনের সাথে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটি ঘটনাকে প্রবন্ধ বা কবিতায় পরিনত করে বাস্তবতায় অনুভব করে। পড়ালেখা করে কেউ দেখা যায় কাজ না পেয়ে ঘােরাফেরা করে।এর মানে এই নয় যে, সে সাক্সেজ নয়,সে বেকার। সে বেকার নয়,কারন তারও একটা কর্ম আছে তা হলাে স্বশিক্ষার বাস্তবতা। তারা তখনই সমাজ স্বাধীনতা না পেয়ে ঘােরাফেরা করে যখন কিছ মুখস্থ বিদ্যায় বিদ্যান ব্যক্তিরা এমন সমাজপ্রন্ধি শিক্ষা লাভের মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষায় এগিয়ে যায় আর সমাজের নজরে পড়ে যায়।যা অন্যদের জন্য অভিশাপ স্বরুপ হিসেবে তারা মনে করে।
আমি তেমন কোনাে মহৎ ব্যক্তি নই যে, আপনারা আমার মতামতকে সঠিক বলে শিকার করতে হবে। আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানটাকে কাজে লাগিয়ে এই ছোট্ট প্রবন্ধটি তৈরি করেছি। অতএব,আমি মনে করি, প্রত্যেক ব্যক্তিরই তার মতামত দানের সর্ব উত্তম অধিকার আছে। এই প্রবন্ধ আমি। মানুষের কিছু ছােট ভূলকে তুলে ধরেছি। যা প্রতিটি জীবনকে বদলে দিতে পারে।
print

কমেন্ট করুন