জিনিয়াস সিক্সটিন – শুভ্র ভৌমিক জয়।

পৃথিবীতে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা এতো বেশী যে তা বলে শেষ করা যাবে না। একজনের কাছে বন্ধুত্ব একরকম তো  অন্যজনের কাছে  বন্ধুত্বের সংজ্ঞা অন্যরকম। বন্ধুত্বের একটি সংজ্ঞা নিয়ে হতে পারে একটি বিশাল বই, কেউ হতে পারে দীর্ঘ বক্তৃতা। আবার হতেও পারে আমার বিরক্তিকর লেখা। তবে সংজ্ঞা ছাড়া বন্ধুত্বের বিশালতা বুঝা কষ্টকর। এক সুবিশাল মনের গুনিজন বলে গেছেন, “বন্ধুত্ব হলো জীবনের সূর্যোদয়”সত্যি অবাক করা বিষয় হলো, তিনি তার বন্ধুদের কতটা বড় করে দেখেছেন। গোটা পৃথিবীর কাছে তুমি শুধু একজন মানুষ মাত্র। আর বন্ধুর কাছে তুমি গোটা পৃথিবী।
ভালো বন্ধুর মাধ্যমে তুমি আর কিছু না বুঝ বা না পাও কিন্তু তুমি কেমন, তোমার ভুলটা সে দেখাবে, আবার তোমাকে তোমার ভালো কাজের প্রশংসাও সেই করবে।তোমার ভালো বন্ধু সে-ই যে তোমার মধ্যকার সর্বোত্তম গুণটা বের করে আনবে। বন্ধুত্ব হচ্ছে দু’জনের পরস্পরের প্রতি গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাশিত আচরণ। বন্ধুত্ব হচ্ছে বিশ্বাস। বন্ধুত্ব হচ্ছে ‘দু’দেহ এক মন। বন্ধুরা জানে এবং মানে তারা পরস্পরের ক্ষতি করবে না। এটা সত্যি যে, বন্ধুত্ব গড়ে উঠে কিছু প্রদর্শিত মূল্যবোধের ওপর। যার মধ্যে রয়েছে বন্ধুর বেলায় সবচেয়ে ভালোটাই ঘটুক এ প্রত্যাশার লালন, সহানুভূতি, একাগ্রতা, সত্যবাদিতা, সততা ও পারস্পরিক সমঝোতা। মানব সভ্যতাই গড়ে উঠেছে বন্ধুত্বের ছায়ায়। ভালো বন্ধু সবারই কাম্য। সৎ বন্ধুর কাছে বা তার সানিধ্য পেতে সবাই ব্যাকুল থাকে।
বন্ধুত্বের রশিটা সব সময়ই জৈব সীমার উর্ধে রাখা উচিত। বয়স ও অর্থ দিয়ে বন্ধুকে পরিমাপ করা উচিত নয়। বন্ধুত্বের জায়গাটা মনের মধ্যে বিশাল করা দরকার। তেমনি বদলে যাচ্ছে বন্ধুত্বের আবেগ-অনুভূতি, গতি-প্রকৃতি।
১৬ই আগষ্ট সাল‌ ২০১৬
সহস্র ভালোবাসা আর বিশ্বাস নিয়ে গড়ে উঠেছে আজকের এই বন্ধুত্ব।সুবিশাল লক্ষ্য আর হাজারো প্রত্যাশা বুকে নিয়ে সেই দিন প্রিয় ক্যাম্পাসটা এসে মিলিত হয়েছিলাম। সেই দিন একসাথে জীবনের মধ্য মণিটুকু তোদের সাথে কাটিয়ে দিবো বলে হাতে হাত রেখেছিলাম। ৮৯ জনের এই ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাসটার ১ম সেমিস্টার থেকে ৭ম সেমিস্টার পর্যন্ত জীবনের ৩বছর ৬মাসের এই অধ্যায়টায় ছিলো দুঃখ-বেদনা আর হাসি-আনন্দ। প্রকৃত বন্ধুত্বে আলোয় আলোকিত যে জন; জীবনযাত্রায় করিয়াছেন, সাইন হয়েছেন তিনিই সফল। আমাদের এই বন্ধু-মহলের  বন্ধুত্বটা ছিলো চুইংগামের মতো। হৃদয়ের কাছাকাছি যা একবার মনে স্থান করে নিয়ে নিয়েছে। এখন তা ছাড়তে চাইলেও তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ৮৯ জন থেকে ঝড়ে যাওয়ার পর ৭ম সেমিস্টারে বন্ধুদের সংখ্যা এসে দাঁড়ায়‌ ৬১ জনে। ভালোবাসার এই মুখগুলোকে নিয়ে একের পর এক পরীক্ষায় অংশগ্রহন।বিভিন্ন স্থানে ভ্রমনের আনন্দসহ নিয়েছি জীবনের পথচলায় সত্যিকারের স্বাদ। ৫০টিরও বেশি সংখ্যক বই পড়ার স্বাদ, ৭টি পাবলিকসহ মোট ১৮টি পরীক্ষায় অংশগ্রহন সবই হয়েছে তোদের সাথে এই ইঞ্জিনিয়ারিং লাইফে। ভ্রমন আনন্দ সে তো প্রতি সেমিস্টারে আমাদের ছিলো নিয়মিত একটি রুটিনের মতো। জীবনের প্রায় পূর্ন স্বাদটুকু তো আমি তাদের সাথে পেয়েছি।

চট্টগ্রামে:
১. খৈয়াছড়ি ঝর্ণা
২. পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত
৩. সীতাকুন্ড চন্দ্রনাথ পাহাড়
৪. সুপ্তধারা ঝর্ণা
৫. সহস্রধারা ঝর্ণা ওঢ
৬. জোরালগঞ্জ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।
সিলেটে:
৭. হযরত শাহ্জালাল মাজার
৮. হযরত শাহ্পরান মাজার
৯. লালাখাল ভ্রমন
১০. জিরো পয়েন্ট,সিলেট
১১. সিলেট চা বাগান
১২. জাফলং
১৩. বিছানাকান্দি।
কুমিল্লায়:
১৪. ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্ক
১৫. শালবন বিহার
১৬. বৌদ্ধ মন্দির
১৭. কুমিল্লা স্টেডিয়াম
১৮. পাবন টেক্সটাইল মিল
কক্সবাজারে:
১৯. কলাতলী সি বিচ
২০. সুগন্ধা সি বিচ
২১. ইনানী সি বিচ
২২. হিমচড়ি
২৩. লাভনি সি বিচ।
চাঁদপুরে:
২৪. পদ্মা-মেঘনার মোহনা
২৫. চাঁদপুর বড় স্টেশন
২৬. মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি-একাত্তর।
নোয়াখালীতে:
২৭. নোয়াখালী জেলা স্টেডিয়াম
২৮. নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
২৯. বেগমগঞ্জ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।
নারায়নগঞ্জে:
৩০. টেক্সটাইল ইন্ডাস্টিয়াল ট্যাুর।
জীবনের ব্যস্ততার ফাঁকে এগুলো ছিলো তাদের সাথে কাটানো সবথেকে আনন্দময় ভ্রমনাবেশ। জীবনের মধ্যমনিটুকু তাদের সাথে কাটিয়ে হঠ্যৎ বন্ধু-মহলের মিলনাস্থল প্রিয় ক্যাম্পাসে আসা আজ আমাদের জন্য নিষিদ্ধতায় পরিনত হয়েছে। কি করা হয় নি একসাথে? ৪র্থ পর্বে একক ছাত্র আন্দোলন! ৫ম পর্বে  ক্যাম্পাস টেক্সটাইল আন্দোলন ও সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা/কার্যক্রম। ৬ষ্ঠ পর্বে প্রতিবাদী আন্দোলন! সবই ছিলো ৬১ জনের একতার মধ্য দিয়ে।আজ আর প্রিয় ক্যাম্পাসের ক্লাসরুমটা ৬১ জন একসাথে বসে ক্লাস করতে পারবো না। ক্যাম্পাস আন্দোলনে ৬১ জন এক কন্ঠে চিৎকার করে নিজেদের জানান দিতে পারবো না।
বন্ধু-মহলকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম বড্ড বেশী।তাই আর হারাতে দিতে চাই না।পারি না ভুলে থাকতে সেই অতীতের কথাগুলো। পারি না ভুলে থাকতে তোদের সাথে কাটানো মুহুর্ত্বগুলো। জীবনযুদ্ধের কোনো এক ময়দানে তোদের পেয়েছি। সেখানটায় তোদের পেয়ে মনে আপন করে নিয়েছি। আজ সেই যুদ্ধের ময়দান থেকে যুদ্ধ শেষে বিদায় নেবার পালা। যুদ্ধে থেকে মিত্রতার হাত বাড়িয়ে মনে যে জায়গা আজ তোরা তৈরী করে নিয়াছিস তা কখনো তোদের সাথে বিবাদ করবে না। জীবনের এমন সব যুদ্ধে তোদের মতো হয়তো অনেক সৈনিক পাবো কিন্তু বিশ্বাস কর হয়তো কখনও তাদের মাঝে তোদের ভালোবাসা আর বিশ্বাসটুকু খুঁজে পাবো না।
৪ই ডিসেম্বর সাল ২০১৯
অবশেষে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং জীবনের চার বছরের অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো। বিদায় লগ্নে এসে ক্যাম্পাসে কাটানো সময়গুলোকে খুব বেশী মিস করবো।ছোটদের সম্মান ও ভালোবাসায় প্রতিনিয়ত মগ্ধ হয়ে থাকতাম।ছোটদের সাথে আর মুখ ধাধানো হাসির খেলাটা হবে না। হয়তো আর আগের মতো একসাথে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া হবে না। প্রিয়দের সাথে জীবনের সুন্দর সময়টুকু ভাগাভাগি করা আর হয়ে উঠবে না। বিদায়ক্ষনে প্রিয় ও ভালবাসার বন্ধুদের বলতে চাই তোদেরকে সব সময় খুব মিস করবো।
তোরা যদি ১শ’ বছর বেঁচে থাকিস তাহলে আমি যেনো একদিন কম বাঁচি। যাতে তোদের একদিনের জন্যেও মিস না করি। বেঁচে থাকতে হলে অবশ্যই ভালো কিছু বন্ধুর প্রয়োজন।আর তোরা আমার সেই বন্ধুগুলো যাদের ভালোবাসায় আর বিশ্বাসে ৩ বছর আগে গড়ে উঠেছিল প্রিয় বন্ধু-মহল। আজ তাদের স্থান পরিবর্তনের পালা।
বিদায়ী দিনটার সকালের সূর্যদয়ের মাধ্যমে শুরু করে মধ্যদুপুর পর্যন্ত হাসি-আনন্দে কাটালাম। নানামুখী আয়োজনের মধ্যদিয়ে বিকালটায় প্রিয়তাদের নিয়ে শুভ্রতায় সেজেছিলাম। সেই সাজ তখন ছিল বিদায় বেলার। আমাদের সেই শুভ্রতায় ভরা আয়োজনটায় স্মৃতিচারনের মাধ্যমে রাঙ্গিয়ে দিয়ে গেলো সেন্হের ছোট ভাই-বোনেরা। মুহুর্ত্বের মধ্যেই প্রিয়তাদের সাথে রঙ্গিন হয়ে উঠলাম। সত্যি বলছি, তখন একটি বারের জন্য মনে হয়নি, আগামীকাল মুখ ভরা হাসি সাথে প্রিয় বন্ধু-মহলকে নিয়ে আর ক্যাম্পাসটা পা রাখতে পারবো না।
ছোট একটা ভাই যখন হঠ্যৎ এসে জড়িয়ে ধরে কান্না করে বলতে লাগলো, ভাই “খুব মিস করবো আপনাদের! ঠিক তখনই মনের মাঝে বিদায়ের ঘন্টা বেজে উঠলো।আর একরকম ইচ্ছা না থাকা শর্তেও কেঁদে ফেললাম।বিদায়ের সন্ধ্যায় শেষবারের মতো করে প্রাণের ক্যাম্পাসটাকে দেখে আসলাম। শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দদের আমাদের প্রতি আত্মত্যাগ কখনো ভুলবো না। প্রাণ-প্রিয় বন্ধু আর সেন্হের ছোটদের তো ভালোবাসা আর সম্মান সবসময় আমাকে তাদের কথা মনে করাবে।সর্বশেষ একটা কথাই বলবো তোদের, প্রিয় ক্যাম্পাসটাকে মনে প্রাণে আগলে রাখিস। আর ডিপার্টমেন্টের জন্য আমাদের আত্মত্যাগের কথাটুকু নিজেদের অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখিস।ভালো থাকিস ছোট।
তিল তিল করে গড়ে সেই বন্ধুত্ব আর হাজারো স্মৃতি আজ এতোটাই জমজমাট হয়েছে যে তোদের ছাড়া জীবনের একটি মুহুর্ত্বেরও কল্পনা করতে পারি না।তাই বিদায় বেলায় তোদের উপর আস্থা রেখে বলতে চাই…..
          তোরা ছিলি! তোরা আছিস!!
          জানি, তোরাই থাকবি!!! বন্ধু😍

কমেন্ট করুন