ছিন্ন মেঘের গর্জন (১ম পর্ব) – শুভ্র ভৌমিক জয়।

মে মাস- সাল ২০১৯,
২৯ তারিখ ঠিক সন্ধ্যায়…
অসম্ভব কিছু পথ-চলা আর চলতে থাকা জীবন যুদ্ধে চলতে চলতে আজ আমি অনেকটাই বড় হয়ে গেলাম।এই জীবন যুদ্ধে দেখেছি অনেক স্বার্থপরতা, পেয়েছি পরাধীনতা আর অনুভব করেছি শূন্যতার হাহাকার।একাকিত্বে ভরা জীবনটায় ছিল শুধুই ব্যর্থতা।
আমারই বা দোষটা কি‌‌ ছিল! জীবনের এই পথ-চলায় পাইনি কখনও অনুপ্রেরণা আর ভালোবাসার বিশালতার খোঁজ।সেই থেকে ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া আমি আজও যেন এক হারিয়ে যাওয়া এই মহাশুন্যের বিশাল আকৃতির মেঘ।কলমটা নিয়ে বসছি আজ শুধুই সেই ব্যাক্তির জন্য যে আমার ছোট্ট কিছু সময়ে চলার পথের সাথী হয়েও হারিয়ে গেলো। তাই সেই মেঘের সম-সাময়িক হয়ে আজ আমি এক ছিন্ন মেঘে পরিণত হয়েছি।
আজ বাবার মৃত্যুর প্রায় ছয় বছর হতে চললো।যখন বাবা মারা যান আমি কিছুটা ছোট ছিলাম।এইতো তখন আমার তেরো বছর।বাবা হারানোর মানে তখন ঠিক তেমন ভাবে বুঝতাম না।সেই দিনটির অশ্রু ঝরা হাহাকার আজও কিছুটা মনের আঙ্গিনায় গাঁথা।সে আর হয়তো মুচবে না কোনোদিন।
আজ বেশ ভালো ভাবেই বাবার শূন্যতাটা অনুভব করছি।জীবনে চলার পথে যার বাবা নেই সেই হয়তো বুঝতে পারে এই পৃথিবীতে বড় হওয়াটা আসলেই কতটা কষ্টের।আজ আমি সেই‌ অবস্থানে দাঁড়িয়ে!
ছোট বেলায় বেশ বায়নায় আর দুষ্টমিতে বড় হয়েছি আমি। মা যখন আমাকে এই বায়না আর অতিরিক্ত দুষ্টমির জন্য আমায় মারতেন তখন বাড়ির আঙ্গিনার একপাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে কান্না করতাম। এই কান্নাটা তখন ছিল অভিমানে গাঁথা।
ঠিক তখনই বাবার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকতাম। বাবা যখন দোকান থেকে বাসায় আসতেন তখনই আমার অশ্রুসিক্ত দু’চোখ মুছে আমাকে ঘরে নিয়ে যেতেন। সেই দিকে মা বাবার কাছে আমাকে মারার কারনে জবাব দিতে হতো।
কার্যক্রমের দিনটা যেদিন বিশ্রামে চলতো বাবার; ঠিক তখন যদি কখনো মা আমায় মারতেন তখনই দৌঁড়ে গিয়ে আস্তায় ভরা বাবার বুকটায় শুয়ে শুয়ে হিচকি তুলে কাদঁতাম। সেইখান থেকেই বাবা-মেয়ের ভালোবাসায় ভরা গল্পটা সূচনা।সেই থেকে কখনও সাহস কখনও বা অনুপ্রেরণায় জাগিয়ে থাকতাম বাবার উক্তিতে।
ভালোবাসার এই বন্ধনে তখনও অভিমান বা রাগের অধ্যায় আসে নি। ভুল করলে আমায় তিনি হাসির আড়াঁলে তা বুঝিয়ে দিতেন কিন্তু তিনি কখনও তা শাসন করে বুঝান নি। হয়তো তেমন পরিস্থিতিটাই আসে নি।
বাবার সাথে গল্প আমার বেশ ভালোই জমতো।কখনও বা খেলার ছলে কিংবা দুষ্টমিতে আমি বাবার চুল আঁচরে দিতাম।মাঝে মাঝে তো পাগলামির ছলে আমার চুলে থাকা ক্লিপ বাবার মাথায় লাগিয়ে দিতাম আর বাবাকে তা আয়না দেখিয়ে বলতাম, “দেখ বাবা, তোমায় কেমন মেয়ে মেয়ে লাগছে” ।
বাবা’র সাথে আমার জীবনের হাসি-কান্না সবটাই চলতো।একটা ভালো বন্ধুর মতো ছিলেন তিনি আমার জীবনে। বাবার অনেক গুনের মধ্যে শৌখিন করে রান্না করতে পারাটা একটা। তিনি আমার মন খারাপের দিনে আমার পছন্দের খাবারগুলোও তৈরী করে দিতেন।
আর অবসর সময়টায় নিজের সবটা দিয়ে তিনি আমায় অনেক কিছু শেখাতেন। বলতে পারেন আমি বাবা’র আদরের ছিলাম অনেক। আমার ছোট্ট পরিবারে আমি আর বাবা ছাড়াও আরো ২ জন ছিলেন। আমার গর্ভধারিনী ‘মা’ আর আমার শ্রদ্ধাভাজন আমার ‘বড় ভাই’। আমি সেই ছোট্ট পরিবারটির সর্বশেষ সদস্য। তাই হয়তো বাবা’র কাছে বেশ প্রিয় ছিলাম। আমার জীবনের প্রথম বন্ধু ‘আমার বাবা’। বলতে গেলে প্রায় প্রতি মেয়ের জীবনের আড়ালে বাবা’র কার্য প্রক্রিয়া থাকে অপ্রকাশ্য বা অতুলনীয়। তারপরও সেইদিক থেকে আমার বাবা হয়তো আমার কাছে তার চেয়েও বেশ কেউ একজন। যেমন ধরেন দোকানের কাজ শেষে বাসায় ফিরতে কোন কিছু নিয়ে আসলে সেই জিনিসটা আমার ভাইয়ের আগে আমার কাছে পৌঁছে যেতো।
ওনার আমাকে নিয়ে বেশ কিছু সপ্ন ছিল।তার মধ্যে একটি ছিল আমাকে গান শেখানোর।কিন্তু বাবা’র অর্থ সামর্থ্যের কাছে সেই ইচ্ছাটা খুব তুচ্ছ হয়ে গিয়ে ছিলো তখন।
আমি যখন অনেকটাই অবুঝ ছিলাম ঠিক তখনই তার পর পর দুইবার হার্ট স্ট্রোক হয়। আমার যখন ১২ বছর আমি তখনও তা জানতাম না। বেশ কয়েক বার হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায়ও ছিলেন ওনি।
সময় বলছে আমার বয়স প্রায় তেরো পেরিয়ে। আমার ছোট্ট বেলার বন্ধু আমার চির সাথী “আমার বাবা” আজ আর নেই!
হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন। সেইদিনই
তৃতীয় বারের মতো হার্ট এবং ব্রেইন স্ট্রোকে মারা যান তিনি। আমার চির-চেনা সেই মুখটি আজ আমার দিকে ফিরেও তাকায় না।সেই দিন থেকেই নিভে গেলো আমার কিশোরী বয়সের অনুপ্রেরণার প্রদীপটি
!”আমার বাবা”!
মানুষ এক প্রকার অভিমানী প্রানী।তাঁদের ভালোবাসা যার প্রতি বেশী অভিমানটা ঠিক তার প্রতিই বেশী হয়ে দাঁড়ায়।আমার ক্ষেত্রে ঠিক তেমনটাই হলো। বাবা’র মৃত্যুর পূর্বে কোনো এক অভিমানের কারনে আমি বাবা’র সাথে কথা বলি নি প্রায় ৬০ দিন বা দেড় মাস। অনেকটা অভিমানী ছিলাম আমি। সহজে নিজের রাগ-অভিমানগুলো কমতে পারতাম না আমি।
সেই ছয় বছর আগের করা আমার সেই ভুলটা আজও আমায় কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আজ আমার দিনগুলো শুধু একটা চিন্তায়ই কেটে যাচ্ছে তখন কেনো আমি এমনটা করলাম।
মারা যাওয়ার ঠিক ৩-৪ দিন আগে বাবা শেষ বারের মতো বিছানায় অসুস্থ হয়ে পরেন। বাবাকে ICU তে নিয়ে যাওয়ার দিন সকাল বেলাও আমি ওনাকে নিজ হাতে জল খাইয়ে দিয়েছিলাম। সেই রাতেই যখন বাবা’র মৃত্যুর খবর শুনতে পেলাম তখন ঠিক কিছু বুঝতে পারতে ছিলাম না। সেই রাতে পিসি-মনির গলা ধরে শুধু একটাই চিৎকার ছিলো আমার “বাবাকে ওরা বাসায় নিয়ে আসে না কেনো???!!!”
সেই থেকেই আমার জীবনে হারানোর খেলা শুরু।আর সেই আমি হারাতে হারাতে এক ছিন্ন মেঘের কাব্যে পরিনত হয়েছি।
আমি লেখক ‘নীলা’ আজ সেই মানুষটিকে ডেকে বলছি যে আমার জীবনের প্রথম অনুপ্রেরণা হয়ে সব সময় থাকবে…….
প্রিয় বাবা,
“জানো, আজ তোমার কথা খুব মনে পরছে। তাই আজ শুধুই বলতে ইচ্ছে করছে বাবা তোমার সাথে আমি যে দেড় মাস অভিমান করে ছিলাম তা আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল! সরি বাবা।আজও মাঝ রাতে কিংবা খেলার ছলে তোমাকে খুব মিস করি।।
সংগ্রহ: জীবন থেকে নেওয়া।
লেখক: নীলা চৌধুরী (ছদ্মনাম)
সম্পাদনায়: শুভ্র ভৌমিক জয়

কমেন্ট করুন