করোনা মোকাবেলায় নার্স একজন নির্ভীক সৈনিক।

মানব সেবায় অনন্য দায়িত্ব পালনকারী নার্সদের স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদর্শনের দিন হলো “আন্তজাতিক নার্সেস দিবস ” । প্রতি বছর মে মাসের ১২ তারিখে আন্তজাতিক নার্সিং দিবস পালিত হয়। ১৯৬৫ সাল থেকে এই দিবসটি পালিত হয় । বাংলাদেশেও এই দিবসটি ১৯৭৪ সাল থেকে সরকারী ও বেসরকারি ভাবে পালিত হচ্ছে । আধুনিক নার্সিং এর প্রবর্তক মহীয়সী সেবিকা ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের সেবা কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে তাঁর জন্মদিন ১২ মে আন্তজাতিক নার্স দিবস হিসাবে পালন করা হয় ।
এ বছর নার্স দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো :
” Nurses
A Voice To Lead Health For All. “
তিনি ১৮২০ সালে ১২ মে ইতালীর ফ্লোরেন্স শহরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন । নাইটিংগেলকে আধুনিক নার্সিংয়ের প্রবর্তক বলা হয়।
নার্সিং একটা সেবামূলক পেশা । বিশ্বের হাজারোও পেশার ভিড়ে এই পেশাটি এখন দিনে দিনে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ।
” নার্স মানেই মনে সাদা, পোষাকে সাদা আচরন ও কর্মে সাদা ” । সবকিছুতেই যেন সাদার সমাহার । শান্তির প্রতীক এই সাদাকে তাঁরা মনে, মননে ধারন করে জীবন / যৌবনকে উৎসর্গ করেন সাদার ভুবনে ।
সেবাই তাঁদের মূল ধর্ম, সেবাই তাঁদের ব্রত । রাত নেই, দিন নেই সংসার, পরিবার, সন্তানের মায়াকান্না তাঁদের সেবাধর্মী মনের কাছে অবহেলিত ও তুচ্ছ। সন্তানের প্রাপ্য ভালবাসা টুকু দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন সাদা পোষাকের নারীরা । কিন্তু তাঁরা কি প্রাপ্য সম্মানী পাচ্ছেন ? বিশ্বব্যাপী মহামারীতে নিঃস্বার্থ সেবাদানকারীরা হল নার্স অদৃশ্য শত্রুর সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে তারা যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তির আপন জন দেখা করা তো দূর খবর ও নিতে আসে না এই দুঃসময়ে আক্রান্ত ব্যক্তি পাশে থেকে অদৃশ্য শত্রুর সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে তারাই নার্স।

নার্সিং পেশার পথটা অতীতে শুধু অমসৃণ ছিলনা, ছিল কাঁটায় ভরপুর । এ পেশার গ্রহণযোগ্যতা ছিল শূন্যের কোটায় । সমাজপতিরা, ধর্মান্ধরা নার্সিং পেশাকে ভালো চোখে দেখতেননা । বরং এই মহৎ পেশার শুভ্রতাকে বিনষ্ট ও কলঙ্কীত করার জন্য বিভিন্ন সময় অভিনব অপপ্রচার চালিয়েছেন । কিন্তু যেখানে মনুষ্য সেবার মতো মহৎ উদ্দেশ্য বিরাজমান, তার কন্ঠরোধ করা অথবা তার চলার পথকে প্রতিহত করার বিপক্ষে স্বয়ং বিধাতাই ছিলেন । যারফলে নার্সিং পেশা সকল প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে, তার অভিষ্ট লক্ষের দিকে প্রবাহমান । সমাজ এখন আর তাঁদেরকে আড় চোখে দেখে না ।

বর্তমানে নার্সিং পেশায় জড়িত মানুষগুলো বিভিন্ন ভাবে শোষিত ও বঞ্চিত হচ্ছেন । যাঁরা সরকারী চাকরী পেয়েছেন তাঁরা কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারবেন । বাকীরা আছেন অতিকষ্টে অথবা বৈষম্যের চরম বেত্রাঘাত প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হচ্ছে । বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, ব্যক্তি মালিকাধীন ক্লিনিক / হাসপাতাল গুলি তাদের মন – মর্জি অনুয়াযী নার্সদের বেতন – ভাতাদি প্রদান করে থাকেন । এ দেশের রোগীরা বেশী সেবা পাবার আশায় ক্লিনিক কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হন । অসুস্থ ব্যক্তির ঔষধের পাশাপাশি সেবাও অতিজরুরী । কিন্তু উন্নত বা মানসম্মত সেবা তখনেই ক্লিনিক মালিক দিতে পারবেন, যখন সেবা দানকারী প্রতিটি ব্যক্তিকে পরিশ্রমের সঠিক ও বাস্তব সম্মত মূল্য দিতে সক্ষম হবেন । নার্সেরা বাড়ি – গাড়ী চায়না । সমাজে সম্মানজনক ভাবে খেয়ে পরে বাঁচতে চায়। ক্লিনিক কতৃপক্ষ নার্সদের কম দিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চান । অন্যদিকে নার্সেরা বাধ্য হয়ে অন্য একটা ক্লিনিকে ডিউটি করেন। যারফলে সেবা থাকে দৌড়ের উপরে । ক্লিনিক / হাসপাতালের মালিকদের নার্সদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে।
আমাদের দেশে অনেকগুলি সেবা খাত আছে । তারমধ্যে স্বাস্থ্য হচ্ছে অন্যতম। আমাদের চিকিৎসা খাতের প্রতি প্রথমে দেশের মানুষের আস্হা ফিরিয়ে আনতে হবে । বর্তমানে আমাদের দেশের বহু মানুষ চিকিৎসা সেবা নেবার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন । কারন একটাই ; এ দেশে মানসম্মত চিকিৎসা ও সেবা পাচ্ছেননা । কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে তা বলা নিতান্তই ভূল হবে । এখানে শুধু অবিশ্বাসের ঝাঁঝালো গন্ধ আর সঠিক সেবা না পাবার অপ্রতিকার যুক্ত অভিযোগ । এর ফাঁকে বিদেশে চিকিৎসার নামে চলে যাচ্ছে দেশের প্রচুর অর্থ ।
বাংলাদেশে সরকারি / বেসরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউট আছে ২০০টি। আসন সংখ্য প্রায় ১৫ হাজারের মতো । বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের তথ্যমতে ডিপ্লোমা নার্স, বিএসসি নার্স মিডওয়াইফারি সবমিলে তাঁদের সংখ্যা প্রায় ৫৬ হাজার। বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের হিসাবে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে প্রায় ৩ লাখ নার্সের প্রয়োজন। অন্যদিকে দেশের নার্সিং ইনস্টিটিউট গুলি থেকে বছরে মাত্র এক হাজারের মতো নার্স পাস করে বের হচ্ছেন। সুতারাং এ পেশায় যারা প্রশিক্ষিত হবেন, তাদের কাজের ক্ষেত্র ফাঁকা আছে।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবমতে, রোগীর সেবা প্রদানকালে একজন চিকিৎসকের সহায়তার জন্য ৩ জন নার্সের প্রয়োজন। সর্বোচ্চ ৪ জন রোগীর জন্য ১ জন নার্স থাকার কথা। ICU, CCU, HDU তে প্রতি বেডে একজন নার্স প্রয়োজন । কিন্তু বাংলাদেশের হাসপাতাল গুলোর অবস্থা এর বিপরীত।সরকারী হাসপাতালে একজন নার্স ৫০ – ৬০ জন রোগীর সেবার জন্য নিয়োজিত থাকেন। বেসরকারি ক্লিনিকে এর চিত্র পর্যাপ্ত রোগী না থাকার জন্য সামান্য কম । সেক্ষেত্রে রোগীরা সেবা তো পাবেন জলছিটার মতো । দেশের সব হাসপাতালে চলছে নার্স সংকট । পাশাপাশি নার্সদের আবাসন সংকটও অন্তহীন । ক্লিনিক / হাসপাতালে নাইট ডিউটি শুরু হয় রাত আটটা থেকে নয়টার ভিতর । নার্সিং পেশায় প্রধানত নারীরাই দখল করে আছেন। বর্তমানে ছেলেদের সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরজন্য নিরাপদ আবাসন থাকা বাধ্যতা মূলক থাকতে হবে। নতুবা তাঁরা কর্মস্থলে যাবার নিরাপত্তা দিবে কে ? এই পঁচন ধরা সমাজে যেখানে ঘরেই নিরাপত্তা নেই নারীদের। রাতে রাস্তায় কে দিবে নিরাপত্তা?
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল হাসপাতালে ( পিজি) এক বক্তৃতায় বলেছিলেন , দেশে দক্ষ নার্স তৈরী করতে হবে । বাংলাদেশে দক্ষ নার্স আছে বলেই বিশ্বের ১৩ টি দেশে প্রায় ৬৫০০ জন নার্স কর্মরত আছেন। বিদেশে বাংলাদেশের নার্সদের চাহিদা আছে কিন্তু সরকারীভাবে পাঠানোর উদ্যেগ ক্ষীণ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনি নার্সদেরকে দ্বিতীয় শ্রেনীর মর্যাদা প্রদান করেছেন।
বর্তমান সরকারের সাহসী উদ্যেগে বয়স বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারীভাবে মেধা ও জ্যেষ্ঠাতার ভিত্তিতে নার্স নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী সংগঠন হিসাবে ভূমিকা রাখতে পারলে, এ দেশের নার্স সম্প্রদায় আরও আলোর মূখ দেখবেন।
নার্সিং পেশার এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে- বিশ্ব নার্স দিবসে এমনটাই প্রত্যাশা। একইসাথে করোনাভাইরাস পরাজিত হয়ে একটি মহামারিহীন নতুন পৃথিবী আমরা শিগগিরই দেখতে পাবো,সেই প্রত্যাশাও সর্বাগ্রে।
সরকার মিজান
সহকারি শিক্ষক (আইসিটি)
নাগাইশ মডার্ন স্কুল