ইচ্ছেতেই মানুষের মূল শক্তি – শিল্পী জুলী।

আমেরিকায় এসে প্রথম কাজ করি মেইসিজ এ। এক মাসের সিজনাল কাজ ছিল ওটা। ক্রিসমাস সিজনে বিশেষ নিয়োগ। ইন্টারভিউয়ে জিজ্ঞেস করলো ঘন্টায় কত করে চাও? নিজেকে কেমন দিন মজুর দিন মজুর মনে হলো। বললাম, তোমার যা ইচ্ছে তাই দিও, আমার শুধু কাজের অভিজ্ঞতা দরকার।
বিশাল দোকান, কাজ বলতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেল করা আর ঘুরে ঘুরে কাপড় গোছানো। প্রথম প্রথম পা ব্যথা করলেও একটি সময় পার হলে তেমন কঠিণ কিছু নয়।মাস দ্রুত কেটে গেল।
শহর বদল হলো। এবার কাজ নিলাম একটি জুতার দোকানে। ইন্টারভিউয়ে জিজ্ঞেস করে, ঘন্টায় কত চাও? স্বভাবগতভাবে উওর দিলাম, তোমার যত খুশী। বলে না না, একটি ফিগার বলতেই হবে। বললাম, তাহলে নয় ডলার করে দিও। বলে, সাড়ে আট করে দেবো। পঞ্চাশ সেন্ট নিয়ে দরাদরি দেখে ভেতরে ভেতরে কেমন যেনো লাগলো। বললাম, তাহলে সাড়ে আট করে আর দিতে হবে না, আট করেই দিও। আগের কাজেও আট ডলার করে দিত।
জুতো বিক্রির কাজ করছি– কাজ হলো জুতো বিক্রি করা এবং বক্স গুছিয়ে রাখা। ভালোই চলছিল। একদিন দুই মহিলা ঢুকেছেন জুতার দোকানে। কতগুলো বক্স নামিয়ে জুতা পরে পরে দেখছেন। কিছুটা পাশেই আমি বক্স গোছাচ্ছি। একসময় তারা বক্স শেলফে রেখে চলে গেলেন। গেইট দিয়ে যেই না বেরুবে ওমনি এলার্ম বেজে উঠলো। ম্যানেজার দৌঁড়ে গিয়ে ধরলো তাদের। আমি তখনও কিছু বুঝে উঠিনি ঘটনাটি। একে আমেরিকায় নতুন, দু’য়ে কাজও নতুন– এই জীবনের অভিজ্ঞতা কম এবং জগৎ চেনা হয়ে উঠেনি ।
মহিলা দু’জনকে সাথে নিয়ে ম্যানেজার আবার ষ্টোরে ঢুকলেন। ঘটনা জানলাম, মহিলাদ্বয় নিজেদের পুরোনো জুতা বক্সে রেখে নতুন জুতা পরে চলে গিয়েছিল। তাদের নতুন জুতা খুলে রেখে আবার পুরোনো জুতা পরিয়ে দিয়ে সাথে হুমকি দেয়া হলো, আবার যদি দোকানের আশেপাশে দেখা যায় তাহলে পুলিশে ধরিয়ে দেয়া হবে। ম্যানেজারই হুমকি দিলেন।
হুমকি দিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার পাশে থেকে জুতা চুরি করলো আর তুমি টের পেলে না?
হেসে বললাম, কী করে টের পাবো আমি, আমিতো ভাবিইনি যে তারা জুতা চুরি করতে পারে।
দুই সপ্তাহ যেতেই বেতনের সময়। রিজিনাল ম্যানেজার একটি খাম দিয়ে বললেন, এই নাও তোমার বেতন। ধন্যবাদ দিয়ে খামটি রেখে দিলাম ব্যাগে। বললেন, কই খুলে দেখো। বললাম, খুলতে হবে না। বলে,আরে দেখোই না। তার পীড়াপীড়িতে খুললাম খামটি। দেখি ঘন্টায় ন’ডলার করে দিয়েছে।
জিজ্ঞেস করলেন, এবার?
হেসে বললাম, ধন্যবাদ।
মনে মনে বলি আট ডলারই কী , আর ন’ডলারই কী–টাকার কদর এখনও কী বুঝি আমি? নাকি কেয়ার করি? বিপদ হলো শুধু সাড়ে হলেই, নিজেকে যেনো কেমন কেমন লাগে তখন।
জুতার কাজ ছেড়ে যখন অরিগনে এলাম প্রথম কাজটি নিয়েছিলাম একটি ফ্যাস্টফুডের দোকানে। কাজ যদি সকালে হতো তাহলে ড্রামের ঠান্ডা পানিতে হাত ডুবিয়ে রেখে আড়াই /তিন ঘন্টা বস্তায় বস্তায় লেটাস ধুঁতে হতো। ঘন্টার পর ঘন্টা ঠান্ডা পানিতে হাত। জমে সাদা হয়ে যেতো হাত দু’খানা। অতঃপর বার্গার বানানো বা ক্যাশ হ্যান্ডেল। আমি যতক্ষণে একটি স্যান্ডউইচ/বার্গার বানাই মেক্সিক্যানরা ততক্ষণে পাঁচটা বানিয়ে ফেলে। হাজার চেষ্টা করেও ওদের কাছাকাছি যেতে পারি না। অবাক হয়ে ভাবী, কী করে এত দ্রুত কাজ করে তারা? অধিকাংশ মেক্সিক্যানরাই কাজে এমন পটু। তারা লড়াকুও, সহসা হাল ছাড়ে না।
ঐ কাজ করাকালীন সময়ে যখনই রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসায় যেতাম, কাঁদতে কাঁদতে–এই করতে আমেরিকায় এসেছি! ভাবতাম, কী কাজে মানুষ আমেরিকায় আসে? আমেরিকান ডিগ্রী ছাড়া বাইরের ডিগ্রীকে তারা মূল্যায়ণ করে না। আবার নতুন করে শুরু করতে হয় সবকিছু। সেইসাথে অচেনা মানুষ, অচেনা দেশ। আমেরিকায় এসে যত কষ্ট করেছি তার সাত ভাগের একভাগ কষ্টও দেশে করলে কোথায় পৌঁছুতাম তার কোন ঠিক নেই।
তিন সপ্তাহের মাথায়ই ফ্যাস্টফুডের কাজটি ছেড়ে দিয়ে প্রি-স্কুলে কাজ নেই। এই কাজটি ভালোই, সহজ এবং আনন্দেরও। বাচ্চাদের সাথে কাজ করে করে মন যখন ভরে উঠলো তখন কাজের পাশাপাশি পড়তে শুরু করি। অতঃপর নতুন ফিল্ডে। ফিল্ডটি পছন্দের হলেও স্ট্রেস লেভেল হাই। এখানেও বেতন বাড়ে ধীর লয়ে। বছরে ঘন্টায় তেতত্রিশ সেন্টের ইনক্রিজ। কখনও বা এক ডলারের। লিস্টে থাকলে এ সপ্তাহেই ইনক্রিজ ঘটবে তেতত্রিশ সেন্টের, হাসবো না কাঁদবো?
আমেরিকায় যত বেশী বেতন তত বেশী ট্রেস। কাজও যায় যখন তখন, সকালে আছে বিকেলে নেই। জীবনে কতবার যে বেকার হতে হয় এদেশে বলা যায় না। তবে বেকার ভাতা আছে, যাতে কোনমতে বাড়ি ভাড়া অথবা খাওয়ার খরচ হয়ত টেনেটুনে হতে পারে। এই চাপে অতি দিলদরিয়া মানুষও হিসেবী হয়ে ওঠে এদেশে– যদি কাজ চলে যায় মাথায় যেনো ছাদ থাকে তখন। নইলে দিনে ফকির রাতে বাদশা অবস্হা।
দূর থেকে দেখে আরেক দেশের জীবন বোঝা কঠিণ। পরখ করে না দেখলে জানা যায় না অন্যের যাপিত জীবন–নিজের জীবনে কী চাই, আর কী চাই না। আর পরখ করে দেখতে গেলেও হয়ত আর ফিরে আসা যায় না আগের জীবনে। সতর্ক মানুষ যাচাই-বাছাই করে জীবনের পথে অগ্রসর হয়। মানুষের জীবনে মোটিভেশন থাকলে সব বাঁধাই অতিক্রম করা যায়। ইচ্ছেতেই মানুষের মূল শক্তি নিহিত।