আতঙ্কিত শৈশব -শুভ্র ভৌমিক জয়।

আতঙ্কিত শৈশব
শুভ্র ভৌমিক জয়
সাল – ২০০৮
প্রায় ১০ বছর হতে চললো আমি মামার বাড়িতে অবস্থান করছি।পৃথক পরিবারে জন্ম আমার।ঠিক বুঝলেন না তো?
ঠিক আছে বুঝিয়ে বলছি!
আমার পৈতৃকনিবাস ছিল চট্টগ্রাম বিভাগের সব থেকে বড় নগরী কুমিল্লাতে।সেখানে যৌথ পরিবারে জন্ম আমার। আমার বাবা-বোন, দাদু, ঠাকুর-মা, কাকা-কাকি একসঙ্গে সেখানটায় থাকতেন।মা বিয়ের আগে থেকেই চাকুরিতে যুক্ত হন।ওনার কর্মস্থল আমার মামার বাড়ির থেকে অনেকটা কাছাকাছি থাকায় ওনি মামার বাড়িতেই বাকিটা কর্মজীবন অতিবাহিত করছেন।ছোট বেলা থেকেই মায়ের সাথে বড় হই আমি।সেখানে আমার বড় হয়ে উঠা।চট্টগ্রামের অন্তর্গত চাদঁপুর ও কুমিল্লা জেলার মাঝামাঝিতে আমার মামার বাড়ি।
কুদুটি গ্রাম…..
আস্তে আস্তে গ্রাম্য পরিবেশে বড় হতে থাকা আমি তখন ৫ম শ্রেণীতে পড়ি। ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কৈলাইন পশ্চিম সরকারি
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র আমি। পড়ালেখার প্রচুর চাপ সেখানটায়। সেই চাপকে টপকে ছোট্টবেলার সেই বন্ধুগুলোর সাথে শৈশবের চলাফেরা আর খেলাধূলা করা।
বিকাল গড়াতেই স্কুল থেকে বাসায় এসে
খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম। অভি,
প্রত্যয়, জামিল, নয়ন, ইরফান সকলকে নিয়ে বিকালটা কাটতো ক্রিকেট খেলায়।
২০শে নভেম্বর,
সোমবার…..
সেদিন দুপুরটা স্কুলে কাটিয়ে বিকেলে এসে খাওয়া-দাওয়া না করেই পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে ক্রিকেট খেলায় নেমে পড়েছিলাম।
আমার মামার বাড়ির ঠিক সামনের দিকের একটা বাড়িতে থাকতে আমাদের খেলার সাথী ও সহপাঠী অভি রাজ।আমার সমবয়সী হলেও শরীরের দিক থেকে সে ছিল বলশালী ও শক্তিমান।দারুন খ্যাপাটে মেজাজের এবং ডানপিঠে। তাই আমরা সবাই তাকে একটু বেশীই ভয় পেতাম।
অভিদের বাড়ির পাশেই আমাদের সুন্দর প্রকৃতিতে ঘেরা ও চারপাশে গাছপালায় ছড়ানো-ছেটানো আমাদের খেলার মাঠ।
সেইদিনও আমরা ক্রিকেট খেলতেছিলাম।
মাঠটা তেমন বেশি বড় নয় তবে আমাদের মতো বাচ্চাদের জন্য তা ছিল যথেষ্ট।
সেই মাঠটির ঠিক দক্ষিন-পশ্চিম কোনায় ছিল বিরাট বড় এক বেল গাছ আর তার পাশাপাশি ছিল একটা বড় শিমুল গাছ। তবে শিমুল গাছটা তুলনামূলক ভাবে বড় হলেও সবার নজর ছিল বেল গাছটার দিকে।সেই গাছটায় অনেক বড় বড় বেল ধরত।তবে কেন জানি না কেউই সেই গাছের নিচেও যেতো না আর সেই গাছের বেল তো খেতোই না।
এমনকি আমরা ছোটরাও গাছটিকে এড়িয়ে চলতাম। বড়রা সবাই নিষেধ করতেন ঐ গাছের আশে-পাশে যেতে। আমাদের মাঝে অভি নামের ছেলেটা ছিল একটু বড় শরীরের। বড় শরীরের মানে আমাদের সাথে একই ক্লাসে পড়ে কিন্তু দেখতে আমাদের চেয়ে বড়। সে হটাৎ করে ওভারের একটি বলকে ছয় মারতে গিয়ে বাঁকা ব্যাটে খেলে ঐ বেল গাছের দিকে মারল। সবাই চেয়ে দেখলাম বলটা সোজা গিয়ে বেল গাছের একটু ঘন জায়গায় পড়লো এবং নিচে পড়ার আর কোনো প্রকার আওয়াজ হল না। তার মানে বলটা আটকে গেলো সেই বেল গাছটায়।
আমাদের মধ্যে এক প্রকার হুলুস্থুল পড়ে গেলো। এবার এই বল পাড়তে সেই গাছে উঠবে কে? কিন্তু কেউ রাজি হলো না গাছের আশেপাশে যাবার। এই দিকে আমাদের মধ্যে সিন্ধান্ত নিতে গিয়ে বেলা পেড়িয়ে এলো।সন্ধ্যার আযান দেওয়ার সময় হলো বলে….
হটাৎ অভি এগিয়ে এসে বললো‌ সে নাকি উঠবে সেই বেল গাছটায়। আমরা সবাই তাকে এক বাক্যে বারন করলাম। কিন্তু সে কোনো কথা শুনলো না আমাদের। এক পর্যায়ে গাছে উঠতে শুরু করলো সে।
বেল গাছ সাধারণত একটু উপর থেকে ডাল ছাড়ায় যা আমরা বড় হয়ে দেখেছি। কিন্তু সেই গাছটায় তুলনামূলক নিচ থেকেই ডাল-পালায় আবরণ ছিল। অন্যদিকে অভি গাছটায় উঠে পড়লো দ্রুত। ও আমাদের চেয়ে একটু লম্বা থাকায় বেশি দেরি হলো না উপরে উঠে পড়তে। আমরাও অভির সাথে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সেই গাছের দিকে।বেল গাছটা খুবই ঘন ছিল। সত্যিই এটা না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবেন না যে এই গাছটা কতটা ঘন। এই নিঝুম সন্ধ্যায় হটাৎ উপরে উঠার পর আমরা আর অভিকে দেখতে পেলাম না।
সে উপর থেকে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে লাগলো বলটা কত উপরে পড়েছে?! আমরা তাকে দেখতে না পেয়ে বার বার বলতে লাগলাম মাঝ বরাবর পড়েছে মনে হয়। একটু ভালোভাবে দেখ!
প্রায় ৪-৫ মিনিট খোঁজাখুজি করেও বলটা পেল না সে। উপর থেকে বললো নেমে যাই? বল দেখতে পাচ্ছি না!!!
আমরা বললাম, ঠিক আছে।
ও নামার সময় হটাৎ আউ করে চ্যাঁচিয়ে উঠলো। আর বলতে লাগলো ওফ ব্যাথা পাচ্ছি রে!
আমাকে ছাড়ো! আমাকে ছাড়ো!!
বাঁচাও বাঁচাও!!!
সে এভাবে চিৎকার করতে করতে খুবই ভয়ানক আওয়াজের মাঝে দ্রুত গাছ থেকে মাটিতে পড়লো। এরপর যা দেখলাম তাতে আমাদের গাঁ সত্যিই চমকে উঠলো। অভির উরুর পাশে এক ছোবল মাংস নেই। একদমই মিথ্যা বলছি না!
কেউ যেন গর্ত করে কেটে নিয়েছে এক মুঠো মাংস। শরীরে তার বিশার আকারের কিছু আছড়ানোর দাগ। মনে হলো যেন বিশাল কেউ তাে শরীরটাকে আছড়ে দিয়েছে। এক নাগাড়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তেছে। অভি গাছ থেকে পড়ে একবার উপরে তাকিয়ে জ্ঞান হারিয়ে বসলো। আমাদের মধ্যে কয়েকজন ভয় পেয়ে নিজেদের বাড়ির দিকে ছুটে গেলো।
আর অন্যদিকে আমি এবং সাথে ২-৩জন অভিকে নিয়ে ওদের বাড়িতে তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম। অভির শরীরটাকে যতক্ষনে গেইট দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকাচ্ছি ঠিক তখনই দেখতে পেলাম তার শরীর রক্তাক্ত লাল হয়ে আছে।আর মুখমন্ডলটা অনেকটা নীল বর্ন ধারন করছে একটু একটু করে।
আমরা তার এই অবস্থা দেখে ক্রমাগত চিৎকার করতে লাগলাম।আমাদের চিৎকার শুনে আঙ্কেল অান্টি বেড়িয়ে এলো ঘরের ভিতর থেকে। তার এই অবস্থা দেখে সবাই ভয়ে কেঁপে উঠলো।অভিকে ঘরে ঢুকিয়ে রাখতেই নির্বাক হয়ে গেলো। দ্রুত আঙ্কেল তাকে নিয়ে ছুটলেন গ্রামের পাশের সরকারি ইউনিয়ন হাসপাতালে।
সেখানে নেয়ার পর অভির তেমন কিছু করা গেলো না। ২০ মিনিট পর অভি মারা যায় সেই হাসপাতালে। তার মৃত্যুতে আমরা সবাই খুব ভয় পেয়ে গেলাম। এমন ছোট বয়সে প্রিয় বন্ধু ও খেলার সাথীর মৃত্যুটা সামনে থেকে দেখলাম।সেইদিন অভির মৃত্যুতে পুরো এলাকার মানুষ জমে যায় তাদের বাড়িতে। অান্টিতো এক নাগাড়ে কান্না করেই চলেছেন।আমরাও জীবনে প্রথম নিজের চোখের সামনে মৃত্যু ঘটনাটা দেখলাম। অভিকে হাসপাতাল থেকে পর দিন সকালে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।সেই দিন বাড়িতে মানুষ ধরে না!
পরের দিন দুপুর বেলা যখন অভির লাশটাকে গোসল করানো হয় তখন সবাই বলছিলো তার শরীর নাকি খুব দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিলো আর কেমন যেন শক্ত হয়ে যাচ্ছিল। এমন অবস্থা দেখে হুজুরের পরামর্শে দ্রুত জানাজা শেষে অভিদের ওদের পারিবারিক কবরস্থানে কবর দিয়ে দেয়া হয়।অভির লাশটা সেইদিন জানাজার পর আর দেখানো হয় নি। যদিও নিয়ম থাকে যে জানাজার পর মানুষ লাশ দেখতে পায়।আমার ছেলেবেলায় এর চেয়ে ভয়ংকর দিনের কথা হয়তো আমার আসে নি। বিশাল এই ঝড়ে প্রিয় বন্ধুটাকে হারালাম। তাও এমন ভাবে যা স্বপ্নেও কখনও ভাবি নি।
এমন ঘটনার পর অভির বাবা নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রন করতে না পেরে সেই বেল গাছটাকে কেটে ফেলেন।সেই গাছটাকে খন্ড খন্ড করার সময় গাছের মূল আর ভেতর থেকে ক্রমাগতই লাল বর্নধারী রক্তের মতো লালা ঝড়ছিল।গাছের সেই ঝোপটা সেই বেলায়ও অভির মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে রইলো।
সেইখানে পাওয়া গেলো ভয়ংকর কিছু শুকনো হাড় আর রক্তাক্ত কিছু পছা কাপড়।কে জানে কোথাকার সেই মানুষ আর কি তার পরিচয়। গাছটা খন্ড করার সময় ঠিক দুপুর ১টা বেজে ২০ মিনিট।
এক দল কালো কাক ক্রমাগতই আমাদের সবার মাথার উপর দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।
কিছু কিছুতো সোজা আমাদের মাথায় বসার চেষ্টা চালাচ্ছে।কিন্তু লোকবলের কারনে সাহস করছে না হয় তো।
সেই দুপুর বেলায় গাছটি কাটার পর সবাই এটা নিয়ে ভয়ে পড়লো। এই দিনের ঘটনার পর আমরা আর সেইখানটায় খেলতে যাই না।আমাদের সাথে আর তেমন কিছুই হয় নি। কিন্তু সেই বেল গাছটি কাটার পর থেকেই নাকি প্রায় রাতেই অভিদের অর্থ্যৎ আঙ্কেলদের টিনের চালে রাতে কেউ আচড়ে পড়তে থাকে এক নাগাড়ে। তারপর ধরেন ধাতব কিছু একটা দিয়ে বাড়ি দিলে যেমন আওয়াজ সৃষ্টি হতো ঠিক তেমনই হতো।
প্রচণ্ড আওয়াজ হলে আঙ্কেল বের হয়ে দেখতে চাইলেও আন্টি তাকে বের হতে দিতেন না। আর ঘুমানোর আগে মাঝে মধ্যে আঙ্কেল প্রায়ই দেখতেন একটা বিৎঘুটে মানব দেহ তার দিকেই এগিয়ে আসছে।
আঙ্কেলরা পরে আর বেশিদিন থাকেন নি সেই বাড়িটাতে। কয়েক মাস পরই বদলি হয়ে যাওয়ায় বাড়িটাকে তালা দিয়ে তারা চলে যান শহরের দিকে।
পরে বছর খানেক পর যখন বাড়িটা বিক্রির জন্য সেই বাড়ি আঙ্কেল আসেন। অফিস করে রওনা করায় সন্ধ্যায় এসে বাড়িতে পৌঁছান। সেই রাতে পাশের বাড়ি থেকে খাবার পেলেও আঙ্কেলকে থাকতে হয় সেই বাড়িটায়। সেই রাতে সব কিছু পরিষ্কার করে ঘুমিয়ে যান তিনি। পরে যা দেখলাম তা আর বলার মতো ভাষা আমার কাছে হয়তো নেই। মধ্যরাতে সেই ঘর থেকে একটা চিৎকারের আওয়াজ। আওয়াজ পেয়েই যখন সবাই বেড়িয়ে পরে তখন ভয়ে ভয়ে আমিও বের হই মাকে নিয়ে। সেই ঘরের দরজাটা কিছুতে খোলছেন না তিনি । আমরা সবাই ভাবলাম হয়তো ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে আছেন।
পরের দিন সকাল ৮টা। এখনও আঙ্কেল উঠছে না। সবাই অনেকটা ভয় পেয়ে দরজা ধাক্কা দিতে লাগলো।এক পর্যায়ে সবাই দরজা ভাঙ্গতে সক্ষম হলো। দরজা ভাঙ্গার পর যা দেখলাম তা তো আর ভাবনাতেই আসে নি কখনও। ভিতরে আঙ্কেলের রক্তাক্ত লাশটা চির নিদ্রায় পড়ে আসে।
আর ঘাটের সব কিছু অগোছালো অবস্থায়।ওনি মাটিতে পরে আছেন রক্তাক্ত অবস্থায় আর ওনার মুখের বর্নটা গাঁড় নীল বর্ন হয়ে আছে।এই অবস্থা দেখে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।পরে জানতে পারলাম বাড়িতে থাকা বাকিরা পরে আন্টিকে ফোন করে জানালে ওনি বাড়িতে আসেন। আর হতভঙ্গ হয়ে পরেন। পরে সাথে সাথে বাড়ির সবাই তাকে জানাজায় নিয়ে কবর দেয়। আর আন্টি এখনও সেই ঘরে স্বামী আর পুত্র শোকে কাতর হয়ে পড়ে রয়েছেন।
কখনও মাঝ রাতে পাগলের মতো রাস্তায় বেড়িয়ে পরেন আবার কখনও বা সন্ধ্যা রাতে এসে মাকে বলতে শুরু করেন, অভি কি আপনার ছেলের সাথে এখনও বসে আছে???
ওকে বলেন তো, সন্ধ্যা হইছে তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসতে!!
এই বাপ-ছেলেকে ডাকতে ডাকতে আমার দিনটা শেষ হয়ে যায়।এই বলে আস্তে আস্তে নিজের বাড়িতে চলে যায়…..
কয়েক বছর পর আমার নিজ ঠিকানায় ফেরার পালা। আমি চলে আসি নতুন ঠিকানায়। তবে আমি আজও জানি না অভি আর তার বাবার মৃত্যুর কারণটা আসলে কি ছিল!
পরিশেষে এখনও ভাবনায় আসে এ কি কোনো অতৃপ্ত আত্মা ছিল নাকি শুধুই অজানা কোনো আতঙ্কের চিন্হ মাত্র!

কমেন্ট করুন